Thursday, November 22, 2018

কলকাতার কার্নিভালের শেষ খেলোয়াড় সন্দীপন



তখন কলকাতার গা থেকে নুন-ছাল উঠছিল। আর এক লেখক তার মধ্যে বসে লিখে চলেছিলেন নাগরিক উদযাপন। এটা বিস্ময়। মাথার টুপি খুলে তাই বাবু সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে অভিবাদন জানানো ছাড়া আমাদের বিশেষ কিছুই করার নেই। আমরা যারা এখনো কলিকাতার নাগরিক। বাঙালি। ভদ্রলোক।
রলা বার্থ লিখেছিলেন ভোলতেয়ার সম্পর্কে, he was the last happy writer. Better than any one else, he gave reason’s combat a festive styleন্দীপনও তাই। আমাদের শহরের শেষ হ্যাপি রাইটার। কলকাতার কার্নিভালের শেষ খেলোয়াড়। একজন শক্তিশালী লেখক তো জানেন তার নিজস্ব সময়ে কী ভাবে টিঁকে থাকতে হয়, দুর্বল ব্যক্তিগত এলিজিকেও কী ভাবে তুলে নিয়ে যেতে হয় শিল্পের চরম পর্যায়ে শুধুমাত্র কলমের জোরে। এটা শুধু ক্ষমতাবান লেখকেরাই পারেন, আর দুর্বল লেখকেরা বিগত সোনালি দিনের জন্য হাহাকার করে । সন্দীপন সবল লেখক, তাই জঁ দ্য ভি নিয়ে প্রবল বেঁচে থাকায় ডুবে যান আর সেটার থেকেই ঠিকরে বেরোয় সৃষ্টি।
আর কি বা তিনি করতে পারতেন? কোন সময়ে কোন শহরে বসে কাজ করে গেছেন আদ্যোপান্ত এই নাগরিক মানুষটি সেটা দেখতে হবে তো? যে কোনো নাগরিক শিল্পীরই তার শহরের সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রয়োজন। তেমনি আবার তার পাঠকেরও জানা প্রয়োজন লেখকের সেই শহরের ইতিবৃত্ত, কোন প্রেক্ষাপটে তিনি লিখছেন।
সন্দীপনের কলকাতার সহজ সত্যিটা হচ্ছে উপনিবেশিকদের তৈরি একটা শহর, যার উদ্দেশ্য শোষণ। আর তার দেশীয় বাসিন্দারা? তারাও আশপাশ থেকে ভিড় জমিয়েছিল একই উদ্দেশ্যে দাঁও মারার মওকা এই লোভ থেকেই শুরু কলকাতারসাদা, ালো দুই চামড়ার মানুষই এসেছে এ শহরে সহজে বড়লোক হতে তো আর কোনো রাজা মহারাজার তৈরি  ইতিহাস প্রসিদ্ধ শহর নয়, বা এ কোনো ধর্মস্থানও নয় যা যুগযুগান্তরের মানুষের তীর্থক্ষেত্রইতিহাস বলে এমন শহর বেশিদিন টেঁকে না, লুঠ-শেষে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। আশ্চর্য, তা কিন্তু হয়নি কলকাতারবুর্জোয়া নাগরিক চেতনা জেগে ওঠে তারই মধ্যেকি প্যারাডক্স, শিল্প সংস্কৃতি সব কিছুই গড়ে উঠল এখানে! এবং যে যাই বলুক এ সংস্কৃতির সব কিছুই, সে রবি ঠাকুরই হন বা বিদ্যাসাগর বুর্জোয়াসিরই ফসল। আর তাই সব কিছুর সঙ্গে চোরাগোপ্তা রয়ে গেল লোভ, মুনাফা, যেন-তেন-প্রকারেণ বড়লোক হওয়ার ইচ্ছে।
সন্দীপন এই কলকাতাকে পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রেতাঁর ঐতিহ্যে বাঙালিয়ানা আর বাঙালি সংস্কৃতির উজ্জ্বল অধ্যায়। অথচ তিনি পেলেন এমন একটা সময় যখন শহরটার উপর জনসংখ্যার চাপ বেড়ে চলেছে, শরণার্থীদের ভিড়ে দম চাপা। আনখশীর নাগরিক সন্দীপন, অথচ তিনি দেখলেন তাঁর শহরটাই কুঁকড়ে গিয়েছে স্বাধীনতাত্তোর ভারতে। ব্যবসার কেন্দ্রে বম্বে আর রাজধানী দিল্লীগোটা এশিয়ার একদা  রাজধানী কলকাতা ধুঁকছে একটা আঞ্চলিক শহর হিসেবে, পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন। এদিকে তত দিনে তাঁর জাতিগত অভিমান শিখিয়েছে যে তার ভাষা তার সংস্কৃতি বিশ্বের যে কোনো অংশের থেকে উৎকর্ষে কম নয়। সে একসময় টক্কর দিয়েছে তার মেধা, মননে ইংরেজ, ফরাসি, জার্মানদের সঙ্গে। একজন আত্মসম্মানী লেখকের কাছে এটা কষ্টের ব্যাপার।
এদিকে সন্দীপনের কোনো হাঁসুলী বাঁক ছিল না। যে জাতীয়তাবাদের আদর্শ স্বাধীনতা আন্দোলনকে পুষ্ট করেছিল, রবীন্দ্রনাথ থেকে তারাশঙ্কর তার থেকে কোনো না কোনোভাবে তাঁদের সৃষ্টির রসদ যোগাড় করেছেন। এমনকি তিরিশের পর থেকে বামপন্থাও রসদ যুগিয়েছিল অচিন্ত্যকুমার বা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়দেরসন্দীপনের সময় অর্থাৎ ষাটের দশকের যে বাম আন্দোলন তা এতই মননহীন, বিচ্ছিন্নতাবাদী, কুঁদুলে স্বভাবের তা তার মত বুদ্ধিমান লোককে আকৃষ্ট করবে তা অসম্ভব। অর্থাৎ চারিদিকে কী অবক্ষয়, কী অবক্ষয়, (এটা মনে রাখতে হবে পঞ্চাশ পরবর্তী কলকাতায় যারা জন্মেছেন তাদের পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয় কারণ তারা এই আঞ্চলিক শহরেই জন্মেছেন)।  
এ তাঁর জানা ছিল বলেই সন্দীপন বুঝেছিলেন, অসম লড়াই। মাণিক-তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণকে টক্কর দেওয়া যাবে না কারণ সময় তাকে আটকে দিয়েছে, যে অভিজ্ঞতার আকর এঁদের ছিল তা শুদ্ধ খনিজ, রেশনের কাঁকড় নয়। বাংলা কথা সাহিত্যের যেগুলো মাইলফলক তা মূলত নাগরিক সমাজের গল্প নয়, তারাশঙ্করের হাঁসুলি বাঁক হোক, বা ঢোঁড়াই, অপুর পৃথিবী বা তিস্তাপারের বাঘারু একটা অন্য জীবনের গল্প অনাগরিক জীবনের ইতিহাস। এই সুবিশাল ইতিহাসের সন্ধানী সন্দীপন ছিলেন না।  ফলে তাঁর সামনে যে নাগরিক কথা-সাহিত্যের উদাহরণ পড়ে রইল তা যথেষ্ট দুর্বলঅন্তত উল্টোদিকে যে লেখাগুলো ছিল তার সাপেক্ষেতাই সন্দীপন চললেন অন্য পথে, ফ্রিভলিটি হয়ে উঠল তাঁর অস্ত্র। কখনো তীক্ষ্ণ শ্লেষ। কখনো হালকা হাসি। কখনো ভাঁড়ামিহ্যাঁ ভাঁড়ামো করতেও ছাড়েননি, তাঁর মনে হয়েছিল ভাঁড় আর নায়ক ক্রমশ জায়গা বদল করে নিচ্ছে এ শহরে। হাসছেন নিজের দিকে তাকিয়েই, নিজের জীবনই তাঁর লেখার উপজীব্য হয়ে উঠছে সমস্যা একটা শান দেওয়া চপারে। ছাল-ছাড়ানো মাংস, সে তো হুক থেকে সামনেই ঝুলে রয়েছে। আমার জীবন। সি আই টি মার্কেটের কজেম মিঞার সঙ্গে লেখক হিসেবে আমার একটুও গরমিল নেই। অন্তত অ্যাপ্রোচের দিক থেকে। (রুবি কখন আসবে)এই অসামান্য একটা জার্নিতে ভাসলেন সন্দীপন। হ্যাঁ তাই সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে আমি ও বনবিহারী, এত বন্ধুর একটা পথপরিক্রমা।


বাংলা উপন্যাসে নিটোল গল্পের একটা কথন তৈরির ইতিহাস রয়েছে। সেখানে গল্পের নানা বাঁক, ঘাত প্রতিঘাত, চরিত্রের বিবর্তন মিলিয়ে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনাক্রম তৈরি হয়। উপন্যাসের ধ্রুপদী চাল সেটাই। বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর থেকে বিমল মিত্র সবাইই এই পথের পথিক। এবং শক্তিশালী লেখক এর মধ্যে দিয়েই তুলে ধরতে পারেন তার জীবন দর্শন, সমাজ ভাবনা, এবং নান্দনিক উৎকর্ষে পৌঁছতে পারে সেই উপন্যাস। বাঙলায় তার নিদর্শন কম নয়, যেমন সাহেব বিবি গোলাম বা পদ্মানদীর মাঝি। এমনকি বঙ্কিমও এর বাইরে নন। যতই তাঁর ভাষা কবিতার কাছাকাছি বলে থাকুন না কেন সন্দীপন, শৈলীর দিক থেকে এর বাইরে যাননি বঙ্কিম, তাঁর সময়ে অবশ্য সেটা ভাবাও যেত না গোটা বিশ্বেই।
সন্দীপন যে পথ ধরেছেন বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ এর পথপ্রদর্শক। ঘরে বাইরে বা চতুরঙ্গ বা শেষের কবিতা-য় কী ঘটছে সেটা বড় কথা নয়, সেই ঘটনার ঘনঘটা আমাদের কত মুগ্ধ করল তাও নয়। এই আশাটা আমাদের ওই উপন্যাসের ধ্রুপদী চালের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের ফল। অথচ আধুনিক মননের মানুষ শুধু গল্প শোনার জন্য উপন্যাস পড়ে না, যদি না সেটা তার অবসর বিনোদনের উপায়-মাত্র হয়ে থাকে। উপন্যাস শিল্প হিসেবে শুধু গল্প বলার তাগিদ নয়, সেটা পড়ার তেষ্টা বেস্ট সেলার জাতীয় লেখাতেই (বাংলা কাগজের পূজাসংখ্যায় এখন যা বেরোয়) মেটে। আধুনিক মানুষের যে চেহারা তা শুধু তার বাইরের আচরণ দিয়ে বোঝা যায় না বরং  ভিতরকার বহু বিরোধের একটা কোলাজ ছবি দিয়ে সেটা স্পষ্ট করা যেতে পারে। এটা উপন্যাসে হাজির করতে গেলে গল্প বলার বাইরে বেরিয়ে নতুন যে কাঠামোর প্রয়োজন সেটা দেখা দেয় গত শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই। 
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এই উপমহাদেশেরও সংস্কৃতিগত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। শিল্পায়ন ও নতুন শহর অঞ্চল গড়ে ওঠে যার ফলে নাগরিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে যায়। উপমহাদেশের সংস্কৃতির বৃহদাংশ গ্রাম জীবন দিয়ে তৈরি, তার একটা গ্রাম সংস্কৃতি রয়েছে ঐতিহ্যে এটা যেমন সত্যি, তেমনি তার অভিমুখ বিশ শতকের থেকে যে নাগরিকতার দিকে এটাও তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। উপন্যাস বা গল্পের ক্ষেত্রে এই প্রেক্ষাপটটা ধরা দরকার ছিল। সমস্যা হল বাংলায় সেই প্রেক্ষাপট যারা ধরার চেষ্টা করেছেন তারা হয় তা কোনো রাজনৈতিক আদর্শের চশমায় অথবা একটা চরম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াশীলতায় দেখেছেন। নিজেদের নাগরিক চেহারাটা সহজে স্বীকার করে তাকে বিশ্লেষণ করাটা বাংলা সাহিত্যের মূলধারার আসেনি। আধুনিকতা একটা বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রশ্রয় দেয়। এর নান্দনিক উপস্থাপনার জন্য ভাঙা কথনের প্রয়োজন গল্প উপন্যাসে। নাগরিক জীবন যাপনের মধ্যে বহুমাত্রিকতা লুকিয়ে রয়েছে, একে ধরার উপায় হিসেবে তাই ন্যারেটিভ ফ্র্যাকচার জরুরি। 
 কারণ সময়ক্রমিক বা ক্রনোলজিকাল ঘটনা প্রবাহ তৈরি করতে পারে না আধুনিকতার ইতিহাস। আধুনিক নগর যাপন ঢিলে একটা ইতিহাস চেতনার উপর দাঁড়িয়ে, সেখানে বদলটাই একমাত্র বাস্তব। এই নিয়ত বদলে যাওয়ায় মাথার ভিতর কোনো সুস্থির স্মৃতি তৈরি হয় না । বরং নানা ঘটনার টুকরো ছবি ব্যক্তির স্মৃতিতে চেহারা নিতে থাকে কোলাজের মতো। এই ছবিগুলোর নির্বাচন তার শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, মনন তৈরি করে দেয়। অর্থাৎ ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ক্রমিক ইতিহাস বদলে যায়। এমন অবস্থায় লেখক, যে নিজেও এর মধ্যেই দাঁড়িয়ে, সে শুধু এই টুকরোগুলো জড়ো করতে পারে। এভাবে গদ্য সাহিত্য বহুস্বর নির্ভর হয়ে ওঠে।
 এই ধরনের উপন্যাস বাঙলায় প্রথম লেখেন রবীন্দ্রনাথ। গল্পের কাঠামোকে বজায় রেখেও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে দেখা যায় চরিত্রের স্বরগুলো আলাদা করে চিনে নেওয়া যাচ্ছে, কথকের নিজস্ব একটা পরিসর তেরি হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের কথা সাহিত্য এর উপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানে গল্পের চমক দিয়ে তার টানটান উত্তেজনা তৈরির থেকেও চরিত্রগুলোর ভিতরের নাড়াচাড়া, তাদের ভাবনা, বোধ, ভুল ভ্রান্তি সব কিছুই সামনে চলে আসছে। অনেক সময় এইসব কারণে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলোকে দুর্বল বলা হয়েছে, আসলে কিন্তু এগুলোই তাদের সার্থকতা। সে জন্য হয়ত এই উপন্যাসগুলো সহজ হচ্ছে না, বা শুধু গল্প পড়ার আনন্দে পড়া যাচ্ছে না। তাতে কিছু এসে যায় না। এখানেই শরৎচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য।
শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন উপন্যাসে দেখা যায় ঘটনার ঘনঘটা। আধুনিক নাগরিক মানুষের মন বোঝা যায় না, দেখা যায় কার্য কারণের জালে বন্দী হয়ে রয়েছে উপন্যাসটি। চমৎকার ক্রাফ্টম্যামশিপ সন্দেহ নেই,  উপন্যাসে প্লটের বিন্যাসের এমন চমৎকার উদাহরণ চট করে দেখা যায় না। কিন্তু এ উপন্যাস আধুনিক মনের  খোরাকি যোগায় না বেশিদিন। এর অন্যদিকে আমরা দেখি চার অধ্যায় বা চতুরঙ্গ-এ প্লট আটপৌরে, ঢিলেঢালা কিন্তু ভাবনার সংঘর্ষে টানটান। দুঃখের বিষয় রবীন্দ্রনাথের পর এই ধারার উপন্যাস লেখায় ভাঁটা পড়ে। ধুর্জটিপ্রসাদ ছাড়া এর উদাহরণ খুব বেশি নেই। রবীন্দ্র পরবর্তী নগরের প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাস  তারাশঙ্কর বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে আটকে। আদর্শ বা প্লট নির্ভর। কথনের সোজা চালকে তাঁরা ভাঙার চেষ্টা করেননি বিশেষ, নিটোল গল্প বলা থেকে সরেননি। জীবনানন্দকে এর মধ্যে ধরা যায় না অবশ্য। তাঁর লেখা অন্য রকম, তবে মনে রাখতে হবে তাঁর কথা সাহিত্য প্রকাশ্যে আসে বহু পরে এবং গত শতাব্দীর আশির দশকে জীবনানন্দের উপন্যাস কলকাতায় ঠিকভাবে ছাপা হয়ে পাঠকের সহজলভ্য হয়।
আসলে উনিশ শতকের কথা সাহিত্যে ইল্যুশন অফ রিয়ালিটি বা সত্যের ধন্দ জাগানোর উপর জোর দেওয়া হত। এর মাধ্যমে পাঠক বিশ্বাস করতে শুরু করে যে গল্পটি সে পড়ছে তা সত্য, অন্তত যখন পড়ছে তখন সে মনে মনে এটা ধরে নেয়। কথা সাহিত্যের গোড়ার কথা হিসেবে এইটাই ধরা হত। সমালোচকরাও এটাকে মেনে এসেছেন অনেকদিন। স্কুল পাঠ্যে আগে প্রশ্ন থাকত (এখনও হয়ত থাকে), অমুক চরিত্রটি কতটা বাস্তব সম্মতভাবে চিত্রায়ন করেছেন লেখক তা আলোচনা করো।  উনিশ শতকের রিয়ালিস্টিক উপন্যাস তথা ডিকেন্স, হার্ডি, ফ্লবেয়র, জোলা এঁদের প্রভাব এটা। বিশ শতকে এসে বাস্তবতার এই সংজ্ঞা আর টিঁকলো না। দেখা গেল যে বাস্তব বলতে সে অর্থে কিছু নেই, যা রয়েছে তা মানুষের মনের মধ্যে পড়া একটা ছাপমাত্র। আর যে যেমন মানুষ, যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর সামাজিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে, সে সেই মত নিজের সত্য তৈরি করে নেয়। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক সত্যই একটা খণ্ড চিত্র মাত্র। তাহলে আর একটা সর্বজনগ্রাহ্য বাস্তবতার আর কেন দরকার উপন্যাসে? এই জায়গা থেকেই উপন্যাস সরে এল জয়েস, উলফ, প্রুস্ত, বেকেট-এর হাত ধরে। অ্যবসার্ড, অবাস্তব, কার্যকারণ পরম্পরার সাযুজ্যহীন ঘটনাবলী, যাদু বাস্তবতা উপন্যাসের কথনকে নতুন করে সাজাল। 
বাংলা কথা সাহিত্য কিন্তু বহুদিন ধরে উনিশ শতকের ধারণাকে বয়ে নিয়ে চলেছে। ফলে নতুন কথন তৈরির ক্ষেত্রে সে রয়েছে পিছিয়ে। গল্প যেন এখনও সেই চণ্ডীমণ্ডপে গোল করে বসে শোনার একটা জিনিস। শুধু কথা সাহিত্য নয় সিনেমা, নাটকের ক্ষেত্রেও বাংলায় একই সমস্যা প্লটের উপর নির্ভরতা। এর জন্য এখনও এই প্রত্যেক শিল্পের ক্ষেত্রে সাধারণ পাঠক বা দর্শক দেখা যায় ওই একই প্রশ্ন করছে গল্পটা কী? মূলধারায় এর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি এখনও কথাসাহিত্য বা নাটক বা চলচ্চিত্র।
আর সেখানে দুঃসাহসী সন্দীপন তাই গল্প উপন্যাসে সহজেই ঢুকিয়ে দেন নানা ব্যক্তিগত অ্যানেকডট, কখনও নাগরিক মিথ ঢুকে পড়ে গল্পের মধ্যে, সন্দীপনের লেখায় আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। জীবন ও মননের একটা টানা উদযাপনের মধ্যে দিয়ে চলে তাঁর লেখা। কলকাতা শহরের অলিগলির মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার সাধারণ কিছু দৈনন্দিন যাপনেও উল্লাস খুঁজে পাওয়া যায়, প্রত্যেক চরিত্র এবং সঙ্গে প্রত্যেক পাঠকও যেন একেকজন উলিসিস যে শহরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে অ্যাডভেঞ্চারে এই অনুভূতিটা সঞ্চার করতে পারেন সন্দীপন। একটা নিঃসঙ্কোচ বুর্জোয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লেখার মধ্যে ফুটে ওঠে, যেটার মধ্যে কোনো আদর্শের দায়ভার দেখা যায় না। সন্দীপনের চরিত্ররাও সন্দীপনের মতোই, ব্যক্তিগতভাবে তারা হার স্বীকার করে, কিন্তু সে দায় কোনো আদর্শ বা মতবাদের কাঁধে চাপিয়ে তার ঐতিহাসিকতা ঘোষণা করতে যায় না।
সন্দীপনের গল্প বা উপন্যাসের কথনের ভিত্তি ইন্টারনাল মনোলগ। স্বগত একটা ভাষা তিনি তৈরি করেছিলেন যেখানে তার চরিত্রগুলো ক্যালাইডোস্কোপের মতো তাদের মানসিক অবস্থার উচ্চারণ করে চলেছে। কমলকুমার-এর প্রভাব তার লেখার শুরুর দিকে অত্যন্ত স্পষ্ট। কমলকুমারের রুক্মিণীকুমার আর বিজনের রক্তমাংসের কথনশৈলীতে ভীষণ মিল। কারণ নাগরিকতার দোলাচলে গল্পের কালপঞ্জিগত কথনের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে নাম চরিত্রের মানসিকতা ও জীবনযাপনের ভঙ্গুর দিকগুলোবিজনের রক্তমাংস, ক্রীতদাস ক্রীতদাসী বা আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি-তে তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য এটা। কথনের ঘটনাক্রমকে গুরুত্ব না দিয়ে এই যে রচনাশৈলী এটা নিছক স্টাইলাইজেশন নয়। আসলে গদ্যে যত এই ঘটনাক্রমের থেকে দূরত্বে যাওয়া যায় কথনটা তত মেটাফর বা উপমার কাছে চলে আসে। ফলে গদ্য আর কাব্যের ভাষাগত বাঁধ ভেঙে যায়। সন্দীপন এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন।
সন্দীপনের পাঠক জানেন যে কীমত বাংলা সাহিত্যের ভক্ত পাঠক ছিলেন তিনি, বঙ্কিমকে তিনি মনে করতেন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, এবং তার উপন্যাস যে কাব্যের কতটা কাছাকাছি এ স্বীকারোক্তি করতেও ভোলেন না। সেই বঙ্কিম যাকে আমরা প্রতিক্রীয়াশিল-টিল বলে বাদ দিয়ে দিয়েছি, তাঁর সম্পর্কে জানালেন পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র সাহিত্য যার প্রথম ঔপন্যাসিকই দেখা দিলেন সেই ভাষা-মর্ম নিয়ে যা কবিতার। ..... যা পাবার জন্য ইউরোপকে প্রায় ৪০০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল...।  সন্দীপনের নিজের ভাষা কতদূর কবিতা সম্পৃক্ত দেখুন
আজ তার মশারিতে একটাও মশা নেই। আজ বাড়ি ফিরে, তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে, সে চলে গিয়েছিল অদূরে লেভেলক্রশিং-এর ওপারে। সম্পূর্ণ অচেনা সেলুনে সহসা ঢুকে শান্ত ও নিস্তব্ধভাবে  সে কামিয়ে নিয়েছে তার শেষ কয়েক মাসের সর্বনাশা দাড়ি। (নিদ্রিত রাজমোহন, সমবেত প্রতিদ্বন্ধী ও অন্যান্য)
এ ক্ষেত্রে কথনের ঘটনাক্রমের কার্যকারণ সম্পর্ক ও ইউনিটি অফ টাইম একেবারেই ঢিলে। এই গল্পের রস পেতে গেলে পাঠককে কবিতার ক্ষেত্রে যে ভাবে আমরা বুঝি সে ভাবেই রাজমোহন নামের চরিত্রটিকে অনুধাবন করতে হবে, সোজাসাপ্টা গল্প হিসেবে পড়তে গেলে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
তবে বাঙালী পাঠকের একটা বড় দোষ যে কোনো লেখাই একটু আবেগপূর্ণ, উদাস উদাস, রুখু রুখু ব্যাপার থাকলেই কাব্যিক বলে দেন, যেমন সমরেশ বসুর কোথায় পাবো তারে,  ভাষাগতভাবে উপমা নির্ভর নয় বরং ঋজু কথন তবুও তাতে কাব্য খুঁজতে হবে। সন্দীপনকে সে গোত্রে ফেলা যাবে না কিন্তু। ক্রিতদাস ক্রিতদাসী দেখুন একটা প্রেমের গল্প, অন্তত কাহিনীর প্রেক্ষিত সেটাইকিন্তু ওই পর্যন্তই। এবং বারবার দেখা গেছে সন্দীপনের কোনো চরিত্র যখন প্রেমিকার সঙ্গে কোর্টশিপ করছে (এখনকার ভাষায় ফ্লার্ট) তখন চরিত্রের মুখের কথা আর মনের ভাবনা এক নেই।
অপবাদ রয়েছে সন্দীপনের নারীরা সব পাউটিং সুন্দরী, কিন্তু তাতে কিছু এলো গেল না, প্রেমের মধ্যে হিপোক্রেসি, রাগ, আবার ভাললাগা একসঙ্গে চরিত্রের মনের ভিতর খেলা করছে তা ধরা পড়ে গেল সন্দীপনের আতস কাঁচে। প্রেম আর ফেরেব্বাজি যে একজন সাধারণ গড়পড়তা মানুষের মধ্যে থাকতেই পারে তার যে ভীষণ প্রেমের সময় মদ খেতে, ঘুমিয়ে পড়তে, এমনকি পালিয়ে যেতেও ইচ্ছে করে এটা সন্দীপন সাবলীলভাবে এনে ফেলেছিলেন আমাদের সামনেনিজেদের আচরণের দিকে তাকালে সন্দীপনের এই সব ব্যাপারগুলো খামোখা চালাকি বলে মনে হবে না আমাদেরকারণ সন্দীপনের লেখায় চরম কোনো আবেগ নেই, যা থাকে ঈশ্বর বা শয়তান প্রেরিত মহামানবের। মুশকিল হল মহামানবদের নিয়ে উপন্যাস লেখা যায় না, সবাই রবীন্দ্রনাথ নন যে অমিত, গোরা, সন্দীপ, সব বিশালাকায় চরিত্র হাজির করবেন। দৈত্যদের দিনকাল নেই, ছফুটের বাঙালি যেমন বিরল হয়ে যাচ্ছে তেমনি সে সব মানুষেরা আশপাশে নেই। সেক্ষেত্রে সন্দীপনের লেখায় ডোবা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
মীরা বাঈ গল্পের মীরা বৌদি, পারেক, বিশেদা সবাই এমনই মানুষ। ভেঙে পড়া বাড়িটা আর তার মানুষজন বন্দী যেন জেলখানায়, যা তাদের নিজেদেরই তৈরি। আর এই গল্পে মিশে যাচ্ছে তাদের রাগ, দুঃখ, কামনা সব কিছু এমনভাবে যা তারা নিজেরাও জানে, এই যে নিজেদের না জানা, এর মধ্যে দিয়েই তৈরি হচ্ছে হিংস্রতা। নাগরিক হিংস্রতা। মীরা মারা যায় গর্ভবতী হতে হতে, সন্তানের জন্ম দিতে দিতে এই নিষ্ঠুরতা ম্লান হয়ে আসে গল্পের শেষে যখন সন্দীপন লেখেন, দরজা জানলা বন্ধ হয়ে গেলে পারেকসাহেব তাই মাঝে মাঝে মধ্যরাতে কাফ্রি হয়ে যেত। লেজের কাছ থেকে চেপে ধরা জ্যান্ত সাপের মতো ঘরের মাঝখানে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে
                       এ-যুগের সতীর মুখোমুখী হত
এই শেষ লাইনগুলোতে সন্দীপন একই সঙ্গে অনিবার্য যৌন তাড়না আর ধর্ষকামের বর্ণনা করলেন। এবং শেষ লাইনটিতে আমরা লক্ষ্য করলাম কবিতার মত স্পেসিং। কোনো নিষ্কৃতি নেই কারো, মীরাকে এ যুগের সতী বলে তিনি চরম শ্লেষটি করলেন। সতী তাকে পাড়ার লোক বলত, অথচ তা সে নয়, তার সূক্ষ্ম সৌন্দর্যবোধ তাকে বিশুর প্রতি আকৃষ্ট করেছে, পারেক-এর যৌন অত্যাচারের প্রতিও কী তার একটা মৌন সম্মতি ছিল না?  তাহলে কথকের এই যে শেষ বাক্যটা কাকে লক্ষ্য করে। সতীত্বের ধারণা, না মীরার সূক্ষ্ম চরিত্রহীনতা, না পারেক-এর মীরাকে বুঝতে না পারার ব্যর্থতা থেকে যৌন আগ্রাসন আমাদের এ প্রশ্নের মুখে পেড়ে ফেলে। ঠিক যেমন বিজনের রক্তমাংস গল্পে স্তব্ধ হবই এটা ভেবে বিজনের বেশি দিন বেঁচে থাকা দরকার কারণ যে কোনো দিন তার বেঁচে থাকার ওষুধ বেরিয়ে যেতে পারে। এ এক আশ্চর্য গোলোক ধাঁধা, তার দুরারোগ্য অসুখটা আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না, সেটা আমাদেরই নাগরিক আশাবাদ।  
বিশু, মীরা, বিজন, রাজমোহন সবাই আটকে রয়েছে একটা বিস্মৃতির মধ্যে, তাদের অতীত নেই, নাগরিক জীবন তাদের রেখেছে সময় আর ভূগোলে বেঁধে। আর এই যে চিরন্তন বর্তমান তাদের যাপন আর স্মৃতির মধ্যেকার কোনো সেতু তৈরি করতে পারছে না এর ফলে তৈরি হচ্ছে বিয়োজন বোধ বা এলিয়েনেশন। এরা সংবেদনশীল বলেই সমাজের মধ্যে নিজের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না। একটা নাগরিক সমাজে বেঁচে থাকতে গেলে পরস্পর সম্পর্কের মধ্যে যে খেলা চলে তার উপাদান ক্ষমতা, এই ক্ষমতার ব্যবহারে কেউ অপারগ হলে বা যদি সে অনিচ্ছুক হয় তাহলে তার এই অবস্থাই হতে বাধ্য। কারণ এই খেলার বাইরে বেরনোর উপায় নেই। কোনো না কোনো ভাবে তাকে যোগ দিতেই হচ্ছে এতে, অথচ সে এঁটে উঠতে পারছে না বা চাইছে না।
নাগরিক জীবন আর ক্ষমতার হাতবদলের ইতিহাসে সজাগ থেকে গেছেন সন্দীপন। এই খেলার সঙ্গে আপোষের বদলে নিজস্ব কিছু ঐকিক যাপনকে সামনে এনেছিলেন তিনি। ক্রমশ তার লেখায় দেখা যেতে লাগল ব্যক্তিগত স্ববিরোধ, স্বেচ্ছাচারকে উপন্যাস, গল্পে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন রুবি কখন আসবে বা এস নীপবনের মতো উপন্যাসে দেখা গেল ব্যক্তিগত অ্যনেকডট মিশে যাচ্ছে উপন্যাসের গল্পে। এখানে সন্দীপনের নিজের চরিত্রই প্রধান হয়ে উঠছে উপন্যাসের থেকে। যত দিন গড়িয়েছে সন্দীপন ক্রমশ এই খেলায় মেতে উঠেছেন। কোথাও যেন একটা তাড়া ছিল তাঁর, নাকি বুঝতে পারছিলেন হয়ত দেরী হয়ে গেল? নিজের এবং লেখক বন্ধু শত্রুদের ব্যক্তিগত যাপন অভিজ্ঞতা ঢুকে যেতে থাকল উপন্যাসে। আগেও যে ঢোকেনি তা নয় কিন্তু কত আলাদা তা সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে। আগে সরাসরি তাদের নাম উল্লেখ করে গল্প শুরু করেছেন এবং অ্যাবসার্ড ন্যারেটিভ তৈরি করেছেন (আত্মক্রীড়া, উৎপল সম্পর্কে)সেই ধার নষ্ট হয়ে গেছে কিছুটা রুবি কখন আসবে-তে।   
নিজের ক্ষমতার প্রকাশ নিয়ে কোনো কুণ্ঠা না থাকলেও হেরে যাওয়ার বোধটা সঞ্চারিত হচ্ছিল লেখায়। ক্রমশ ব্যক্তিগত আক্রোশ এই শহুরে, সফিসটিকেটেড মানুষটার লেখায় ঢুকে পড়ল। উইট-এর যে একটা নৈর্ব্যক্তিকতা থাকে সেটা অতটাও অমলিন থাকেনি লেখায়। এটা হওয়ারই ছিল। যে জায়গাটা থেকে তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন সেটা এতই টালমাটাল, আশির দশকের প্রায় গ্রাম্য একটা কলকাতা, পৃথিবী বিচ্ছিন্ন, কুয়োর ব্যাঙ সংস্কৃতি এই অসহায়তা তৈরি করবেই।
একুশ শতকে এসে যখন বিশ্বায়িত পৃথিবীর সামনে আমরা দাঁড়ালাম, সন্দীপনের জগতটা চোখের সামনে আরেকটু স্পষ্ট হল।  একটি নিজস্ব বাঙালি নাগরিকতা এবং তার জীবন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল লেখক সেভাবেই লিখেছেন যেভাবে একমাত্র লেখা যায়। সন্দীপনের সমসাময়িক প্রতিভাশালী গদ্য লেখকরা যেটা পারেননি তা হল তাঁর এই বোঝাটাকে ধরতে। নাগরিকতার ভিতর গিয়ে ঢুকে তার রক্তমজ্জা ধরে এমন টান মারতে আর কেউই চেষ্টা করেননি। ফলে যেটা হয়েছে একটা নকল উপর চালাক শহুরে লেখা যার কোনো শৈল্পিক উত্তরণ নেই। সন্দীপনের ক্ষেত্রে অনেক ভান, চালাকি, গাল-গল্প, মিথ তৈরির ব্যাপার ছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে এটা এমন এক ঐকিক স্টাইল তৈরি করে যেটা বাকিদের ছাপিয়ে যায়। সাহিত্য শেষ বিচারে আমাদের আর কী দিতে পারে, গ্লোরিয়াস নাথিং ছাড়া। আর গত পঞ্চাশ বছরে বাংলা কথা সাহিত্যে এর উদাহরণ কোথায় সন্দীপন ছাড়া?

প্রকাশিত: কালি ও কলম পত্রিকা

No comments: