আমার পথ নিও না যেন,
অবলুপ্তির দিকে।
এই কী শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি দীর্ঘ সময় ধরে ভারত-পথিক, দর্শন আকাঙ্ক্ষী
অ্যালেন গিনসবার্গের, বাঙালী কবিদের প্রিয় অ্যালেনদাদার? এই পঙক্তি লিখছেন
গিনসবার্গ উনিশ বিরানব্বই সালে, ছেষট্টি বছর বয়সে, প্রথম ভারতে আসার একত্রিশ বছর
পরে। এর মধ্যে তাঁর দু দুটো বিখ্যাত ভারত-ভ্রমণ হয়ে গেছে, তিনি আর বিস্ময়-প্রতিভা
নন মার্কিন কবিতার, বিট জেনারেশনের সর্বসম্মত ঈশ্বরও নন, বিতর্কের নায়ক নন কোনো – বরং বৃদ্ধ কবি, সর্বজন
মান্য, জনপ্রিয়। আর তার সারা জীবনের শেষে আফটার লালন কবিতায় এই লাইন কি হতাশা, তার
ভারত আবিষ্কারের, বা তাদের সবার ভারত আবিষ্কারের।
আমেরিকান কবিতায় ভারতবর্ষ, শব্দটা বা ধারণাটা একটা দেশ বা জনজাতিকে বোঝায়
না, বরং সেখানকার কবি বা দার্শনিকদের কাছে ভারত একটা বিশেষ ভাবনা, একটা দর্শন। আর এটা এটা শুধু
গিনসবার্গ বা বিট প্রজন্ম তৈরি করেনি তার বহু আগে থেকেই, উনবিংশ শতক থেকেই এই
ধারণা তৈরি হচ্ছিল। আমেরিকা ভারতের মতো নিজেই একটা উপনিবেশ, যদিও তার জন জাতি ইউরোপীয়দের
দিয়েই তৈরি। এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে সিভিল ওয়ার তার ইতিহাস ইনসুলেটেড বা তার
নিজের চৌহদ্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সে কখনওই ইউরোপের মতো সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা
করেনি এশিয়া, আফ্রিকায় উনিশ শতকে।
এই অবস্থায় তার ভারতবর্ষের সঙ্গে সামান্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও, মূলত
ইউরোপের মাধ্যমেই তার ধারণা তৈরি হচ্ছিল ভারত সম্পর্কে। ইউরোপের কাছে ভারতবর্ষ
একটা সমস্যা। প্রথমত সে উপনিবেশিক প্রভু, তারা নিজেদের উচ্চতর মানুষ মনে করে
ভারতবাসীর থেকে, এবং তার সভ্যতাকে ভারতীয়দের থেকে উচ্চতরই জ্ঞান করে সে। এদিকে
ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্প হোক সাহিত্য হোক বা দর্শন তাকে মুগ্ধও করছে। সে
একেবারে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে না সেদিক থেকে। এই সমস্যার একটি স্বাভাবিক সমাধান
পাওয়া গেল ইউরোপীয় মানসে, সে ঠিক করে নিল ভারতবর্ষের সংস্কৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক
ও ধারণা কী হলে তার দুকুলই বজায় থাকে। সে বলল ভারতীয় সংস্কৃতি অত্যন্ত উন্নত ও
সমৃদ্ধ ছিল প্রাচীন কালে কিন্তু তা ভেঙে পড়েছে, আমরা সেই জায়গায় এসেছি উচ্চতর
ধারণা নিয়ে যা তাকে তার পুরনো জায়গা ফিরিয়ে দেবে, পুনরুদ্ধার করবে তার হৃত গৌরব।
ব্যাস এটা তাদের রাজনৈতিক দর্শনের সমস্যা মেটাল, না হলে উপনিবেশের কোনো নৈতিকতা
থাকে না। এটা যে শুধু নিজেরা ভেবে ছেড়ে দিল নয়, ভারতীয়দেরও এটা বোঝাতে সক্ষম হল,
এতটাই যে স্বাধীনতার পরও তার ফল আমরা ভোগ করছি, উপনিবেশিকতার খোঁয়াড়ি যাকে বলা হয়
আর কি।
আমেরিকানদের কাছে ভারত নিয়ে সে সময় এই মাথা ব্যথা ছিল না, প্রথমত তারা
ভারতে উপনিবেশ তৈরি করেনি, দ্বিতীয়ত তারা উপনিবেশের বিরোধী, তার স্বাধীনতা যুদ্ধ
আর তার গণতন্ত্রের লড়াইটা ছিল ইউরোপের এই
অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ভারতের বিষয়ে তারা সমব্যথী হতে
পারত কিন্তু এটাও আবার মনে রাখতে হবে যে একে তারা ইনসুলেটেড তায় আবার তাদের রক্তে
রয়েছে ইউরোপের উত্তরাধিকার – তারা সেটলারর্স, নেটিভ নয় কোনো দিনই।
ফলে ভারত তার কাছে একটা কল্পনার দেশ যেন, সে ভারতের দর্শন তার সমাজ সব কিছুকেই
দেখে এক্জটিক হিসেবে, বা বিস্ময়কর অপর হিসেবে। এখনো গড়পড়তা মার্কিনদের কাছে ধারণটা
বোধহয় তাইই।
আমেরিকান দার্শনিকরা নিজেদের মতো করে ভাবতে শুরু করলেন, কবিরাও তাই, তা
ইউরোপের থেকে আলাদা হবে এই জায়গাটা তাদের সবসময়ই ছিল।
~
ব্লেকের একটা বই হাতে নিয়ে পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হল কানের কাছে কে একটা পড়ছে
কবিতাটা, এ স্বর অচেনা, নিউইয়র্কের হার্লেম-এ বসে এক দিব্যদৃষ্টি হল তরুণ এক কবির।
তার স্পষ্ট ধারণা হল উইলিয়াম ব্লেকের গলার স্বর সেটা, বাইরে আকাশে দেখলেন স্বর্গীয়
এক নীল হাত যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে নির্মাণ করে চলেছে। এই তরুণ কবির নাম অ্যালেন
গিনসবার্গ। সালটা ১৯৪৮। উন্মাদনার মধ্যে দিয়ে আবিষ্কার করলেন নিজেকে, ছটফট করতে
লাগলেন এই অনুভূতির কথা কাকে বলবেন, কের্যুক,
বারোজ, নীল ক্যাসিডি?
একটা গোটা প্রজন্ম তখন খুঁজছে, আধ্যাত্মিকতাকে, ঈশ্বরকে, শিল্পকে,
সর্বোপরি নিজেকে। বিট জেনারেশন নামে যারা পরে পরিচিত হবে
এবং তাদের ঘিরে
তৈরি হবে অসংখ্য গল্প, মিথ। তখন কিন্তু সময়টা অন্যরকম ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বদলেছে, বিশ শতক থেকেই সে অপ্রতিরোদ্ধগতিতে
এগিয়ে চলেছে নতুন দিকে, অর্থনৈতিকভাবে পুঁজিবাদের নতুন কারখানা সেট দেশ। এবং
ইউরোপের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে সে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশ হয়ে ওঠার লক্ষ্যে
এগিয়ে চলেছে। সোভিয়েত কম্যুনিজমের সঙ্গে তার টক্কর ঠাণ্ডা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
এখানে স্বাধীন সাহিত্যিক, শিল্পীর জায়গা কী? আমেরিকার উদার গণতন্ত্র যা
ব্যক্তির উন্মেষের জন্য, জেফারসন, টম পেইন, লিঙ্কনদের আদর্শের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে
না, উনিশ শতকের যে দারুণ ভাবনাগুলো সেগুলো আমেরিকার সমাজ থেকে পরিত্যক্ত হচ্ছে। এই
সময় তরুণ লেখক শিল্পী এমনকি সাধারণ ব্যক্তিরও নাভিশ্বাস উঠতে শুরু করে দিল, কেউ
হয়তো ছাত্র, বা কেউ বেশিদূর পড়াশোনা করে উঠতে পারেনি, বা কেউ হয়তো বিশ্বযুদ্ধে
সাধারণ সৈন্য বা জি.আই, কেউই বুঝতে পারছিল
না যান্ত্রিক সমাজের মধ্যে তার নিজস্ব জায়গা কোথায়।
এমন অবস্থায় সেই তরুণ যুবকেরা বেরিয়ে পড়ল, অন দ্য রোড, তাদের আর্থিক
নিরাপত্তা, বিশাল সম্পদ, বিলাস দরকার নেই। তারা খুঁজতে শুরু করল যা কিছু মানবিক।
বিট প্রজন্মের আদর্শ বলতে এটাই, এটাই তার ভিতরের কথা।
অ্যালেন লিখলেন,
I
saw the best minds of my generation destroyed by madness, starving
hysterically naked
এই পঙক্তি গোটা এক প্রজন্মের মনের কথা। জ্যাক কের্যুক ঘুরে বেড়াচ্ছেন
আমেরিকা জুড়ে হিচহাইক করতে করতে নীল ক্যাসাডির সঙ্গে। বারোজ একটার ওর একটা নেশা
পরীক্ষা করে চলেছেন যাতে তার মনের ভিতর থেকে উঠে আসা অবচেতন শিল্প তৈরি হয়। র্যাবু,
জেনে, স্যুররিয়ালিস্টদের কাজ, লেখা ঘেঁটে চলেছেন তারা। এই সময় দাঁড়িয়ে হিন্দু ও
বৌদ্ধ দর্শন তাদের কাছে একটা আশ্রয় হয়ে দাঁড়াল।
গ্যারি স্নাইডার, কবি, পর্বতারোহী, বৌদ্ধদর্শন পণ্ডিত, সান ফ্রান্সিসকো
এবং গোটা ওয়েস্ট কোস্ট-এ যুব সমাজের কাছে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মের চর্চা, হাইকুর
অনুবাদ করে চলেছেন, থাকছেন নিজের মতো করে একটা যাপনে, কঠোর দারিদ্র কিন্তু আনন্দের
সঙ্গে। জ্যাক কের্যুক হীনযানী বৌদ্ধধর্মের থেকে জেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন
গ্যারির সংস্পর্শ এসে। আর গিনসবার্গের হাউল-এর বিস্ময়কর পাঠ গ্যালারি সিক্স-এ, ছ’জন কবি ও তার
বন্ধুবান্ধবরা মিলে কবিতা পাঠ হুল্লোড়ের
উদযাপন হল, এর মধ্যেই করেন সবাই শুনল গিনসবার্গের এই অদ্ভুত কবিতা। সম্পূর্ণ নতুন
এক ভাষা, প্রত্যেকের কবিতার মধ্যেই ছিল সময়ের আর্তি, আর নতুন সৃষ্টির উদ্দামতা। সেদিনের
কবিতা পাঠ, হুল্লোড়, মদ্যপান ইতিহাস হয়ে যাবে এতটা সেই তরুণেরা কেউই ভাবেননি।
খবর কিন্তু ছড়িয়ে পড়ল বিদ্যুতের গতিতে। ওয়েস্ট কোস্ট-এ সানফ্রানসিসকো, বা
লস অ্যাঞ্জেলস নয়, নিউ ইয়র্কেও ছড়িয়ে গেল খবর। একই সঙ্গে অশ্লীলতার অভিযোগ উঠল
গিনসবার্গের বিরুদ্ধে।
ধর্ম ও তার উদযাপন বিট প্রজন্মের একটা আত্ম-জিজ্ঞাসার দিক মাত্র, আর সেই
ধর্মীয় যাপন আমরা যেমন বুঝি তার মতো নয়, অর্থাৎ এই শিল্প সাহিত্য দর্শন
জিজ্ঞাসুদের ভারতীয় সাত্ত্বিকদের সঙ্গে গোলালে চলবে না। এটা ব্যক্তি তার সামগ্রিক
পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে কী ভাবে নিজের উন্মেষ ঘটাতে পারে এবং সৃজনশীল হতে পারে
তার নিরন্তর চেষ্টা। এখানে ধর্মের সূত্রের আলোচনা বা মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে কোনো
মেয়ের সঙ্গে অবাধে শোয়া, বা একই সঙ্গে জ্যাজ মিউজিকে ডুবে গিয়ে আবার পুঁজিবাদের
বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, সবটাই সম্পৃক্ত।
হাউল, জাঙ্কি, অন দ্য রোড ওই প্রজন্মের বিস্ময়কর বইগুলো প্রকাশ পেতেই
আমেরিকায় তোলপাড় হয়ে গেল, এবং নেগেটিভ পাবলিসিটি সত্ত্বেও কিছুটা প্রতিষ্ঠা লাভ
করলেন গিনসবার্গ, করসো, কের্যুকরা। তাতে তাদের নিজেদের কাজের পরিধি বাড়ানোর একটা
সুযোগও হল। আমেরিকার বাইরে তারা যেতে শুরু করলেন, বারোজ, মারাকেশ-এ নেশার সন্ধানে
কিছুটা সিয়া-র হাত থেকে পালানোর জন্যও বটে, স্নাইডার জাপানে বৌদ্ধধর্ম চর্চায়।
গিনসবার্গ পরিকল্পনা করেন ভারতবর্ষে যাবেন। গুরু খুঁজবেন তিনি।
গিনসবার্গ যখন নিউ ইয়র্কে এইসব পরিকল্পনায় মশগুল তখন তার সঙ্গে দেখা হয়
বুদ্ধদেব বসুর। বুদ্ধদেবকে তিনি বলেন যে ভারতের উদ্দেশ্যে বিট জেনারেশনের তাবড় চার
লেখক রওনা দিচ্ছে। বুদ্ধদেব বসুর বর্ণনা পরে বোঝা যায় যে তিনি নিজে এই কবিদের
উদ্দেশ্য সম্পর্কে খুব একটা আস্থাভাজন ছিলেন না, এবং তাদের যাপন সম্পর্কে তাঁর খুব
ভাল ধারণাও ছিল না। যদিও গিনসবার্গকে তাঁর ভালই লেগেছিল।
এই যাত্রা নিয়ে গিনসবার্গ শুধু নয় বিট প্রজন্মের অনেকেরই যথেষ্ট উৎসাহ
ছিল। ভারতবর্ষ তাদের কাছে উত্তরণের চাবিকাঠি। হুইটম্যান-এর ভবিষ্যবাণী ভারতবর্ষ
থেকেই শুরু হবে নতুন কবিতার যাত্রা তাদের মাথায় ছিল, তাই তাদের এক নতুন প্যাসাজ টু
ইন্ডিয়া।
~
আই, ওয়াল্ট হুইটম্যান আ কসমস – উনিশ শতকে আমেরিকায় বসে যে কবি এমন
দৃপ্ত ঘোষণা করেন তার কথায় কান দেওয়া যাক। প্রথমত, হুইটম্যান শেলি, কিটসদের শেষ উত্তরসূরি,
শেষ রোম্যান্টিক। দ্বিতীয়ত, তিনি নতুন বিশ্বের আদি কবি, আমেরিকায় অ্যালান পো ছাড়া
এই বিষয়ে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
লিভস অফ গ্রাস, সারা জীবন ধরে এই নামের যে বইটি হুইটম্যান লিখে গেছেন,
সেটা আসলে একইধারে মহাকাব্য, বেদ ও সংবিধান।
সংবিধান ও ধর্মীয়সূত্র আলাদা করে হচ্ছে না, না কারণ গণতন্ত্র ও আধ্যাত্মিক
দর্শন হুইটম্যানের কাছে এক। একই সঙ্গে এটা তাঁর দায়িত্ব কারণ তিনি আবার রোম্যান্টিকও
বটে কবি ও দ্রষ্টা আলাদা নয়, এবং তারাই ভবিষ্যত পৃথিবীর সংবিধান-লেখক এটা পুরোপুরি
রোম্যান্টিকদের দর্শন। এই দুই এর সমন্বয়ে হুইটম্যান যযা সৃষ্টি করলেন তা অভূতপূর্ব।
প্যারাডাইজ লস্ট বা গ্যেটের ফাউস্ট-এর থেকে আলাদা মহাগ্রন্থ বটেই বরং উপনিষদ বা
রামায়ণ মহাভারতের মতো মহাকাব্যের সঙ্গে তুলনীয়, হুইটম্যান নিজেও তাঁর পুরো বইটিকে
বলতেন অনসমব্ল, প্রত্যেক কবিতাই ধরা যেতে পারে একেকটা সূত্র।
হুইটম্যানের এই আজব কবিতাগুচ্ছের মধ্যে রয়ে গেছে একটা গোটা পৃথিবী। এই
পৃথিবী তৈরি আধুনিক গণতন্ত্রী মানুষের ভাবনা দিয়ে, এর নায়ক সাধারণ মানুষ কাঠুরে,
কামার, কৃষক, দোকানদার, চোর ছ্যাঁচোড়, বেশ্যা সকলেই, কেউ অপাংক্তেয় নয়। হুইটম্যানের
এই আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে মিশেছে দর্শন যেখানে প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকে যুক্ত
গায়ের রঙ, জাত, ধর্ম, শ্রেণিভেদ পেরিয়ে।
এই ধারণা থেকে হুইটম্যান প্রায় অদ্বৈত দর্শনের কাছে পৌঁছচ্ছেন, যেখানে
কোনো সত্ত্বার আলাদা অস্তিত্ব নেই, প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে যুক্ত যখন ব্যক্তির
সর্বোচ্চ বিকাশের স্তরে জাগ্রত। এবং সেই জায়গায় পৌঁছনোর পথ খুঁজছেন তিনি কর্ম-মার্গের
মধ্যেই এবং অবশ্যই যেখানে গণতান্ত্রিক ভাবে মানুষের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হবে। এবং
অবশ্যই হুইটম্যান ভারতীয় দর্শনকে এড়াতে পারলেন না বা চাইলেন না।
The
past – the dark unfathom’d retrospect!
The
teeming gulf – the sleepers and the shadows!
The
past – the infinite greatness of past!
For
what is the present after all but a growth out of the past? ক
তাঁর যে গৌরবোজ্জ্বল অতীত দরকার, তা শুধু ইউরোপীয় ইতিহাস বা দর্শন থেকে নয়
যার বিরুদ্ধে লড়াই করে নতুন প্রজাতন্ত্র তৈরি, তার গোটা পৃথিবীর সমগ্রতা লক্ষ্য,
কারণ তাহলেই তা প্রকৃত গণতন্ত্র হতে পারে। আর তাই প্যাসাজ টু ইন্ডিয়ায় তিনি লিখে
চলেছেন এই সমগ্রের কথা যেখানে ইঞ্জিন, আর সুয়েজ ক্যানেল জুড়ে চলেছে এশিয়ার সঙ্গে
ইউরোপ অ্যাফ্রিকা, যেখানে ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কারখানা স্থাপন এবং
পুরোটাই আত্মার উন্নতির জন্য, এখানে কোনো বিরোধ নেই, এখানে কিপলিং-এর মতো ইস্ট ইজ
ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট ইজ ওয়েস্ট দে নেভার টোয়াইন শ্যাল মিট এর অন্তর্দ্বন্দ্ব নেই,
শাসক-শাসিতর মাঝের দেওয়াল নেই।
বলা বাহুল্য আমেরিকা তখনও গোটা পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারের জায়গায় নেই এবং
নিও-কলোনিয়ালিজম তো দূর তখনো পৃথিবী জুড়ে উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের স্বর্ণযুগ। এর মাঝে বসে আমেরিকায়
নতুন পৃথিবীর কবিতা ও স্বপ্নের কথা লিখলেন ওয়াল্ট হুইটম্যান যার মধ্যে ভারতীয়
দর্শন অঙ্গীভূত হয়ে গেল।
~
গিনসবার্গ ও তার সঙ্গী পিটার অর্লভস্কি মুম্বাই বন্দরে পৌঁছলেন, ১৯৬২ সাল,
সেই প্রথম ভারতে পা রাখলেন গিনসবার্গ। গ্যারি স্নাইডার অবশ্য পোঁছে গেছিলেন আগেই।
এই দুই বিট কবির ভারতে আসার কারণ সম্পূর্ণ আলাদা। গিনসবার্গ চান গুরু, হার্লেম-এ
তাঁর যে দিব্যদর্শন হয়েছে বলে মনে করেন তা সম্পর্কে সন্দেহ দূর করে দেবেন এমন
গুরু। স্নাইডারের এমন কোনো উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ছিল না। তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে
জাপান থেকে এসেছেন তিনি, কারণ বৌদ্ধধর্মের আদি উৎসস্থল সম্পর্কে কৌতূহল, এবং
ভারতীয় যোগ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জানতে।
গিনসবার্গ কী গুরু পেলেন আদৌ? সারা দেশ জুড়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন, যেখানেই
কোনো সাধু, সন্ন্যাসীর খোঁজ পেয়েছেন ছুটে গেছেন, কথা বলেছেন রিকশাওয়ালা থেকে ইন্টেলেকচুয়াল
সবার সঙ্গে। গোটা ট্যুরটায় যা যা ঘটেছে ছোট ছোট ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে কারো সঙ্গে
কথোপকথন, সব কিছু তিনি তাঁর জার্নালে লিখছেন, রেকর্ড করেছে টেপ-এ। ধরতে চেয়েছেন
তাঁর নিজের ভিতরের দ্বন্দ্বগুলো আর একই সঙ্গে ভারতীয় দর্শনকে। সে চেষ্টায় তিনি
কতদূর সফল হয়েছেন সে নিয়ে প্রশ্ন তুলে লাভ নেই, কিন্তু তিনি ভারতবর্ষকে দেখতে
পেলেন, এসেছিলেন গুরু খুঁজতে তার চোখে ধরা পড়ল বাস্তবের ভারত, তার গরীব অসহায়
জীবন, তার বড়লোকের উদাসীন তাচ্ছিল্য ভরা অস্তিত্ব, মারাত্মক এক বৈপরীত্য টাকা নেই
অথচ হাসিমুখ, এদিকে আবার হাহাকার।
গিনসবার্গের কবিতায় গুরু, ঈশ্বর, লালন, কবির এসব শব্দের খোলস ছাড়লে দেখা
যাবে কঠিন কঠোর দেশের বাস্তব ছবি। গিনসবার্গ, স্নাইডার, অর্লভস্কি কেউই এড়াতে
পারেননি এই বাস্তব ছবিটা, যা তাদের পীড়া দিয়েছে।
গিনসবার্গ অর্লভস্কি কলকাতায় এসে তখনকার তরুণ কিছু বাঙালি কবি যেমন সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিত হন। এদের
সঙ্গে কলকাতার অলিগলি ছাড়াও শ্মশানে বীরভূমের তারাপীঠে তান্ত্রিক সাধুদের আস্তানায়
ঘোরেন। যদিও এই বাঙালি কবিদের তাদের নিজেদের দেশের দর্শন সম্পর্কে ধারণা ছিল গিনসবার্গদের
থেকেও কম, তবুও গিনসবার্গের আকর্ষণে এবং তার যাযাবর জীবন ভীষণ আকৃষ্ট করে তাদের।
বিশেষ করে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে, যদিও একজন মধ্যবিত্ত বাঙালির পক্ষে সেই জীবন
অসম্ভব ছিল এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় গিনসবার্গদের ধারে কাছে পৌঁছনর মতো সাহস, বা
যোগ্যতা কোনোটাই ছিল না।
এলএসডি বা হ্যালুসিনেটরি নেশার মাধ্যমে অবচেতনকে মুক্ত করার ব্যাপারটা
বাঙালি কবিদের আশ্চর্য করেছিল, এবং একই সঙ্গে শ্রেণীগত অভিমানকে পাত্তা না দেওয়া
ছিল তাদের কাছে বিস্ময়, কারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই বিভাজন-বোধ তীব্র এবং কবি বা
সাহিত্যিক হলেও তাদের শ্রেণিগত হীনমন্যতা ছিল। এদের সঙ্গে ঘুরে ভারতের সাধারণ
জীবনযাপনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয় গিনসবার্গের। তাদের সঙ্গে হুল্লোড়, নেশা, ও
কবিতাপাঠে ভালই সময় কেটেছিল গিনসবার্গের।
কিন্তু অ্যালেন সে যাত্রায় কখনওই খুঁজে পাননি, যার খোঁজে তিনি এসেছিলেন।
সেটা সম্ভব ছিল না। তিনি যে দার্শনিক ভারতবর্ষকে খুঁজছিলেন তা কখনওই বিশ শতকের
ভারতবর্ষে পাওয়া যায় না। তিনি খুঁজছিলেন, ধরা যাক চৈতন্য বা শঙ্করাচার্য বা কবিরের
মতো একজনকে, যা আধুনিক ভারতে সম্ভব নয়।
কখনো মেহেরবাবা, কখনো শিবানন্দ, তো কখনো রমনা মহর্ষি, গিনসবার্গ ছুটে
বেরিয়েছেন, আর তাদের এই কর্মকাণ্ডের উৎসাহে পরবর্তীকালে অসংখ্য আমেরিকান ইউরোপিয়ান
ভারতবর্ষে আসেন, গুরুর সন্ধানে, আধ্যাত্মিকতার সন্ধানে। এই এক স্টিরিওটাইপ তৈরির
জন্য কিছুটা তিনি দায়ী – হরে কৃষ্ণ হরে রাম জেনারেশন,
বিটনিক, হিপি।
ভারতীয়রা অবশ্য হিপি বলতে বোঝে গাঁজা, চরস আর অবাধ যৌনতা। তাদের মধ্যবিত্ত
অর্ধশিক্ষিত মনের এর থেকে বেশি বোঝার ক্ষমতা হয়নি যে, মাদক আর যৌনতার পিছনে এই
তরুণ প্রজন্মের একটা প্রতিবাদ লুকিয়েছিল আর ছিল আত্মসমীক্ষা। যাই হোক যে কারণেই
হোক এই স্টিরিওটাইপের পিছনে অ্যালেন গিনসবার্গদের অবদান রয়েই যাচ্ছে। অথচ
গিনসবার্গ নিজে যতটা না দায়ী আরো বেশি দায়ী ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও ভারত সরকার।
আমেরিকার মতোই ভারতীয় পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র দফতর সন্দেহের চোখে দেখত অ্যালেন
বিট প্রজন্মকে। বেনারসে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে পরতে হয় অ্যালেন ও পিটারকে,
এবং ভিসার সময়সীমা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁদের বহু কাঠখড় পোহাতে হয়। প্রায় একবছরের
উপর তাঁরা ভারতে কাটানোর পর অ্যালেন আবিষ্কার করেন যে কোনো জীবিত গুরু তাঁর পাওয়া
সম্ভব নয় এবং বৃন্দাবনে তাকে এক সন্ন্যাসিনী বলেন, ব্লেক-কেই তাঁর গুরু হিসেবে
স্বীকার করে নিতে।
একই সঙ্গে ভারতবর্ষ সম্পর্কে তাঁর চোখ খুলতে থাকে, তার দারিদ্র তার
সামাজিক অবস্থা অনেক বেশি ভাবাতে শুরু করে। অ্যালেনের লেখায় ফুটে উঠতে থাকে এই সব
দিকগুলো যা আমেরিকার ভারত-দর্শনে আগে কখনো ছিল না। অ্যালেন প্রতিবাদ আন্দোলনের এক
মুখ হয়ে ওঠেন, আমেরিকার ভিয়েতনামে বর্বর আক্রমণ হোক বা নানা প্রতিবাদ আন্দোলনে অংশ
নেন। গান্ধিবাদী তিনি কখনোই ছিলেন না তবু অ্যালেনের এইসব প্রতিবাদে অহিংসার আদর্শ
লক্ষ্য করার মতো।
লালন, কবির, সুফি, বাউল, গান্ধি গিনসবার্গকে দিয়েছে অনেককিছু। তিনি
ভারতবর্ষে এসেছিলেন গুরু খোঁজে, সেটার মধ্যে এক সারল্য ছিল যা প্রায় বোকামি বলা
যেতে পারে, যার প্রত্যক্ষ ফলাফল দেখা যায় প্রায় দু’দশক ধরে, ভারতে এই একই
খোঁজে বারবার বহু বিফল চেষ্টা। আবার একই সঙ্গে দেখা যায় ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরোধিতা
থেকে এমনকি এখনকার উই আর নাইনটি নাইন আন্দোলনের মধ্যে অহিংস প্রতিরোধের পরম্পরা
যাও এই বিটদের জন্যই সম্ভব হয়েছে অনেকটা।
গিনসবার্গের দ্বিতীয় বিখ্যাত ভারত-সফর একাত্তরে, বাংলাদেশে বিধ্বংসী
বন্যার পর। এবার আর কোনো গুরুর খোঁজ নন, এবার তিনি আসছেন মানুষের খোঁজে, তাদের
দুর্দশার মধ্যে পাশে দাঁড়াতে, এবার সরাসরি এবার স্পষ্ট
Millions
of daughters walk in the mud
Millions
of children wash in the flood
A
million girls vomit and groan
Millions
of families hopeless alone…
এই জানার রাস্তাটা কঠিন ছিল, কারণ আগে থেকেই কোনো রাজনৈতিক বা তাত্ত্বিক
অবস্থান নিয়ে তারপর সেই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এই বোঝাপড়ার সামনে এসে দাঁড়াননি, তিনি বা বিট প্রজন্মের সঙ্গীরা কেউই তা করেননি। তাঁদের সফর শুরু হয়েছিল অন্তরের প্রশ্ন
থেকে, ভিতরের একটা তাগিদ থেকে। তাঁদের মানসিক খোঁজের মধ্যে থেকেই তার
উত্তর সন্ধানে যে যার মতো করে নিজেদের উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন। ভারতবর্ষের সনাতন দর্শন তারা খুঁজতে এসে
আধুনিক ভারতকে খুঁজে পান,
তার সমস্যা ও তার পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেন। যদিও তাদের সেই খুঁজে পাওয়ার মধ্যে ব্যথা
ছিল গিনসবার্গ তাই হয়তো সাবধান করে দিতে চেয়েছেন, এভাবে নয় এভাবে নয়, আমেরিকার চোখে যে আদর্শ ভারত সেটা আদপে তা নয়। হুইটম্যানের স্বপ্নের ভারত ছেড়ে নতুন
কবিকে খুঁজতে হবে সমসময়ের রাস্তা।
২৬ জুলাই ২০১৩

No comments:
Post a Comment