Tuesday, August 22, 2023

মিলান কুন্দেরার স্লোনেস : অত্বর ও দেখনদারির বৈপরীত্যের সন্ধানে

 

এই আলোচনার মতো বিপদজনক কাজ কখনই করিনি। স্লোনেস এমন একটা উপন্যাস যে তার আলোচনা করতে যাওয়া একটা ফাঁদ, যে ফাঁদ স্বয়ং উপন্যাসের বিষয়। বিশেষ করে এই আলোচনা কোনো সালো বা কফি শপের নিভৃত গোষ্ঠীতে করছি না করছি সাধারণের জন্য, একটি পত্রিকায়। যা কুন্দেরার উপন্যাসের প্রেক্ষিতে আসলে ডান্সিং বা গোদা বাংলা করলে বলতে হয় নাচন-কোঁদন!

কুন্দেরার উপন্যাস পাঠের মজা সেখানেই যে তা আবেগ অনুভূতির উদ্রেক না করে বরং সেই আবেগ বা অনুভূতির যৌক্তিকতা বা অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একে কুন্দেরার সিগনেচার
বলা যেতে পারে, লাইফ ইজ এলসওয়্যার বা আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং-এর মতো উপন্যাস যেমন সেই স্বাক্ষরে উজ্জ্বল। স্লোনেস-এও দেখি সেই একই জিনিস, শুধু এখানে তার হিউমার আরো উদার, এ যেন গোটা সমসময়ের উপর যেন একটা মুচকি হাসি।

স্লোনেস উপন্যাস শুরু হচ্ছে লেখক-কথকের বয়ানে, কুন্দেরা নিজেই এখানে একজন চরিত্র যিনি গল্পটা বলছেন, ছুটি কাটাতে সস্ত্রীক চলেছেন একটা শাত্যুতে প্যারিসের কাছে যেটা এখন একটা হোটেল। তার কোনো তাড়া নেই, আর তাই সহ নাগরিকদের গতির প্রতি উন্মাদ আকর্ষণ তাকে ভাবাচ্ছে সমসময়ের এই তাড়া নিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে উপন্যাস এগোতে শুরু করে, চরিত্রগুলো তাঁর মাথায় আসছে এবং কোনো মতেই তিনি ওই উইলিং সাসপেনশন অফ ডিসবিলিফ রাখছেন না। এ যেন চাচা কাহিনীর কথক, ফেলে ছড়িয়ে বলছেন গল্প, আড্ডার মেজাজে। আর আড্ডা আমরা সকলেই জানি যে শুধুমাত্র গল্পের প্লট নির্ভর নয় বরং তার একটা ঢিলেঢালা গতি থাকে, তাতে এসে মেলে নানা ভাবনা, তত্ত্ব, অ্যানেকডট।


আড্ডার ছলেই তিনি যে ঘটনাগুলো অবতারণা করলেন সেগুলোকে বাঁধার চেষ্টাও করেননি। মূল একটা যদি গল্প দেখি তা হল, একটি অষ্টাদশ শতকের উপন্যাস দানন-এর নো টুমরো আর তারই সঙ্গে সমসময়ের কয়েকটি ঘটনা। দানন-এর উপন্যাসটি ল্যাকলস-এর লিয়াজঁ ডেঞ্জারাস এর মতো বিখ্যাত না হলেও তা সে সময়ের বেশ আলোড়িত একটি লিবারটাইন উপন্যাস। তার বিষয় এক প্যারিসিয়ান ভদ্র যুবকের মাদাম টি নামের এক মহিলার সঙ্গে এক রাত্রের প্রেমের উপাখ্যান। আজকের ভাষায় যাকে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড বলা যেতে পারে। এখানেই বিষয়টা উল্টে দিয়েছেন কুন্দেরা সেই একটি রাত, অষ্টাদশ শতকের ভাবনায় যে মন্থরতা ও শৈল্পিক ধৈর্য দেখি যৌনক্রিড়ার তা যেন অনন্ত এক প্রক্রিয়া আর তাই তা শিল্প। কথক কুন্দেরা বলছেন যে গতিময়তা আমাদের শিল্প,যৌনতা ও যাপনকে কুৎসিত করে দিয়েছে।

এই ভাবনাটা ইউরোপীয় মূলধারার দর্শনের বিপরীত। আধুনিক ইউরোপ বা বুর্জোয়া ইউরোপীয় সংস্কৃতি নিজেকে বুঝিয়েছ এবং তার

  উপনিবেশের মানুষদের (যেমন আমাদের) শিখিয়েছে যে সময়ের দাম তার ইউটিলিটিতে। আমাদের কবিও লিখে ফেলেছেন সময় বহিয়া যায় ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি...। কিন্তু এর মূল্য যা চোকাতে হয়েছে তা কম নয়। অথচ এ ভাবনা আমাদের দেশে নতুন নয়, কালিদাস থেকে বাৎস্যায়ন সবাই এই অত্বরকে প্রয়োজন বলেছেন। বরং ইংরেজ এসে বলে গেছে আমাদের সঙ্গীত আমাদের নাচ মন্থর তাই বিরক্তিকর। শেষের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ সময় নিয়ে অমিত রায়ের মুখ দিয়ে পাতার পর পাতা অত্বরের কথা বলিয়েছেন, এমনকি ডান-এর ফর গড শেক হোল্ড ইয়োর টাং অ্যান্ড লেট মি লাভ এর মতো রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনাকে বদলে দিয়েছেন ওরে একটু সবুর কর। এই সবুর বা অত্বর ব্যাপারটার দরকারি এ আমরা বুঝি, কিন্তু ইউরোপের কাছে এ খুব ভাল জিনিস না, কুন্দেরাও লিখছেন অত্বরকে ইউরোপ মনে করে অপচয়। প্রেম, শিল্প, আনন্দ এ গতির বিষয় নয় এ যেন ইউরোপ ভুলে গেছে অষ্টাদশ শতকের লিবারটাইন উপন্যাসকে ইন্টারটেক্সচুয়ালি এনে ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী বুর্জোয়া ইউটিলিটির ধারণাকে দাড়িপল্লায় তুলে একচোট হেসে নিয়েছেন কুন্দেরা। এ হাসির আবার ভয়েরও।

ভয়ের কারণ রয়েছে। এই গতিময়তা আবেগকে নষ্ট করে কারণ তা স্মৃতি তৈরি করে না। কুন্দেরা বলছেন, স্মৃতির থেকে পালাতে লাগে গতি আর অত্বর আমাদের স্মৃতিকে উপভোগ করতে সাহায্য করে। স্মৃতিহীন গতিময়তার অনিবার্য ফল কী তা এই মাস মিডিয়া ও সোশ্যাল নেটওয়ার্কের যুগে আমরা বেশ বুঝতে পারছি। তা তৈরি করে কিট্জ বা দেখনদারি। কিট্‌জ বা দেখনদারির বিষয়টা কুন্দেরার উপন্যাসে আমরা আগেও দেখেছি, বিশেষ করে অনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং-এ। স্লোনেস-এও দেখি সেই দেখনদারির খেলায় কিভাবে আমরা ঢুকে পড়ি। তারকা-বুদ্ধিজীবী বের্ক নামের চরিত্র আমাদের চারপাশেই রয়েছে, যে টিভি-র পর্দায় মুখ দেখাতে ব্যস্ত, এবং তার জীবনের লক্ষ্য কোনোভাবে বুদ্ধিমান কথা বা ভাবনা বা বিষয় যা আম লোককে আকর্ষণ করবে তার চেষ্টা করে যাওয়া। এই নিরন্তর চেষ্টার হাত থেকে আমরা বাঁচতে পারি না। একেই কুন্দেরার আরেক চরিত্র পঁতভিন বলছে নাচন-কোঁদন বা ডান্সিং। এ একটা পার্ফরম্যান্স যেটা সারাক্ষণ চলছে, আমরা প্রত্যেকেই একই সঙ্গে সেই নর্তক ও দর্শক। রাজনীতি, আন্দোলন, যুদ্ধ, প্রেম, যৌনতা সবই একটা পাবলিক পার্ফরম্যান্স হয়ে উঠেছে। যেন একটা নিরন্তর রিয়ালিটি শো।

পঁতভিন এক আশ্চর্য চরিত্র। তার মধ্যে একটা সাবেকি আড্ডাবাজ রয়েছে। সে ক্যাফেতে বসে একটা অন্তরঙ্গ আড্ডা চালায়। এই ডান্সিং তার না পসন্দ। এ একদিকে যেমন কুন্দেরার একটা অলটার ইগো। মনে হয় চাচা কাহিনীর চাচা। সে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন চায় না বরং তাকে সন্দেহ করে। তার দর্শনকে সে লিপিবদ্ধ করতে চায় না বা তাকে আনতেও চায় না সাধারণের কাছে। কারণ তাহলে সে নিজেও ওই নাচনের অংশ হয়ে উঠবে। তার ভাবশিষ্য ও বন্ধু  ভিনসেন্ট তাকে বলে তুমিও তো এই আড্ডায় একই কাজ কর, তখন সে বলে তা করে কিন্তু তা ব্যক্তিগত গণ্ডির মধ্যে বলে এর মধ্যে একটা নিজস্বতা রয়েছে। পঁতভিন বলছে যে এই দেখনদারির যে আধুনিক চেহারা তার মধ্যে রয়েছে অদৃশ্য দর্শকের উপস্থিতি। অর্থাৎ কেউ থাক বা না থাক আমরা সারাক্ষণ এই দেখনদারি ও পার্ফরম্যান্সে রপ্ত হয়ে উঠছি। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট দর্শক দরকার নেই, আমরা সারাক্ষণই ভেবে নিচ্ছি যে তারা উপস্থিত। তাই পঁতভিনের নিজের যে আড্ডাকালীন উপস্থাপনা তা আলাদা কারণ সেখানে তার নিজস্ব পরিচিত ও পছন্দের শ্রোতা-দর্শক রয়েছে। এবং তা মানবিক, সে কোনো মহিলাকে সিডিউস করার জন্য করতে পারে, বা বন্ধুদের খুশি করতে, কিন্তু তা কখনই কোনো মরালিস্টিক জায়গা থেকে হবে না। কারণ এই মরালিজম তার কাছে ছদ্ম।

ভিনসেন্টকে আমরা দেখি একইরকম ভাবে ওই দেখনদারিতে ডুবে যেতে। সে পঁতভিনকে নকল করার চেষ্টা করে, এবং সাধারণ্যে সেই চেষ্টা হাস্যকর হয়ে ওঠে। তার ফল, সে যে মেয়েটিকে সিডিউস করার চেষ্টা করে এবং রাত্রে তার সঙ্গলাভের চেষ্টা করে তা ব্যর্থ হয় হাস্যকর রকমভাবে। উপন্যাসের শেষে সেই বোধহয় সবচেয়ে দুর্ভাগা মনে হয়। সকালে তাকে দেখা যায় বিফল মনে প্যারিসের দিকে রওনা হতে। তার আগে সেই শ্যাতু-তে দেখা হয় দাননের অষ্টাদশ শতকের যুবকের সঙ্গে। একই শ্যাতু একই জায়গায় দুজনের দুই অভিজ্ঞতা। একজন অত্বর কামনার সফল প্রতিভূ আরেকজন তার খণ্ডিত সময়ের গতিময়তা নিয়ে ব্যর্থ। এখানে কুন্দেরা স্পষ্ট (এত স্পষ্ট করে কোনোদিন কুন্দেরা কে দেখা গেছে কি কোনো একটি ধারণাকে বাছতে?) তার সহানুভূতি কার দিকে। পঁতভিন-এর শিষ্য ফিরে যায় ব্যর্থ হয়ে। সেও ওই দেখনদারির অংশ হয়ে উঠেছে।

ভাবার বিষয় এই লেখাটা লেখার পর আমিও কি কুন্দেরার এই দেখনদারি-র অংশ হয়ে উঠলাম না? কারণ আমিও তো কোনো অন্তরঙ্গ
আলোচনার বাইরে এই লেখাটা লিখে ফেললাম। যেমন কুন্দেরাও লিখে ফেলেছেন উপন্যাসটি। অর্থাৎ আমরা কে যে কখন ওর অংশ হয়ে উঠি বোঝা শক্ত!


 

স্লোনেস মিলান কুন্দেরা

ইংরেজি অনুবাদ লিন্ডা অ্যাশার

প্রকাশক ফেবার অ্যান্ড ফেবার

No comments: