Friday, January 16, 2026

নীল ক্যাসিডির গাড়ি থেকে নামা যায় না

 

নীল ক্যাসিডির গাড়িতে একবার উঠলে আর নামা যায় না বুঝিনি তখন । সেই যে একটা গান শুনেছিলাম ছোটবেলায় হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া সেই এক ভূতে পাওয়া হোটেল যাতে ঢোকার রাস্তা আছে কিন্তু বেরনোর উপায় নেই, প্রিজনার অফ ওন ডিভাইস নীল ক্যাসিডির গাড়ি না ক্যেরুয়াকের কলম যাই হোক না কেন একবার ধরলে ছাড়ন নেই। যদিও ওই যে বললাম বুঝিনি তখন। কুড়ি বাইশ বছরের যুবকের কাছে অন দ্য রোড এমন নেশা যা কোনো রিহ্যাব ছাড়াতে পারে না তাদেরও উপায় জানা নেই।

অথচ বইয়ের মধ্যে ঘর করা নতুন নয়। কলকাতার স্কুলে পড়ে বারুইপুরে থেকে, যে যাতায়াতের দীর্ঘ সময় ও একাকীত্ব তা ভরাট করবে তারাই এ খুব সহজ ব্যাপার একা কৈশোরে কাল্পনিক পৃথিবী মিশে যাবে, আর তারপর কী করে হেমিংওয়ে, টেড হিউজেস চলে আসে, প্রেমে পড়ে সুনীল গাঙ্গুলী, শক্তি চট্টো বা জয় গোঁসাই ঢুকে পড়ে  তারপর কামু বা কাফকা না বুঝেই স্বাভাবিক বাঙালি যৌবন আসে। তার মধ্যে এক বইমেলায় কেনা বইটা গাড়ির তলা দিয়ে রাস্তার এক লো অ্যাঙ্গেল শট (তখন জানতাম না অবশ্যি লো হাই এসব), গোলাপি আভার সেই রাস্তার চলমানতা আমায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল। পেপার-ব্যাক বইটার পিছনে লেখা ছিল অন দ্য রোড সোল্ড আ ট্রিলিয়ন লিভাইজ অ্যান্ড আ মিলিয়ন এসপ্রেসো মেশিন, অ্যান্ড আলসো সেন্ট কাউন্টলেস কিডস অন দ্য রোড বারোজের বিখ্যাত উক্তি, কিন্তু বারোজকে জানি না। এই লেখককেও না। তখনও ঝটাঝট গুগলবাবার সিধু জ্যাঠামো ছিল না, জানতে গেলে লাইব্রেরি আর

অ্যামেরিকান সাহিত্য নিয়ে উৎসাহী কাউকে চিনতাম না। এখনো গিনসবার্গকে বাঙালি যদ্দুর চেনে (কৃত্তিবাসী কবিদের দৌলতে?) ক্যেরুয়াককে নয়, স্নাইডার তো আরোই নয়, মজার ব্যাপার স্নাইডার আর গিনসবার্গ এক সময়ে এদেশে পা দিয়েছেন অথচ বিট নিয়ে খুব বেশি উৎসাহ নেই, হিপি আর বিট প্রায় এক।

এহেন বই মনে আছে কিছুদিন আলমারি-বন্দি ছিল, ভুলেই গেছিলাম নানা বইয়ের মাঝে। তারপর প্রথম পাঠ, সে অভিজ্ঞতা শুধু তাদের জন্য যারা ওই  বয়সে পড়েছে। গোটা পৃথিবীকে দেখাটা বদলে গেল এক ঝটকায় সমাজ, জীবন, যাপন সবকিছুকে নতুন চোখে দেখা। এব্ং ওই ইচ এর পাল্লায় পড়া। উদযাপন নিয়ে আমার যে হ্যাংলামি তার জন্য হয়তো পুরোপুরি দায়ী ক্যেরুয়াক। নাহলে কী হত, সাহিত্য চর্চা, সাংবাদিকতা এসব নিয়ে দিব্যি থেকে যেতাম ক্যেরিয়ার নামক কিছুর একটা খোঁজে, সাহিত্য চর্চাও খানিক হত সবদিক বাঁচিয়ে। কিন্তু বারবার দূরছাই ভাল্লাগছে না ব্যস এবার একটা বদল দরকার এমনটা হত না। ওই যে বন্দী মানুষ আমি, নাকি রাস্তার উপরে থাকার একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গেল, যেখানে বাড়ি বা রাস্তা বলে আলাদা করে কিছুই হয় না আসলে সবই স্থাবর আবার সবই জঙ্গম তুমি যেভাবে দেখতে চাও এই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা যা তোমায় তীব্রতা দেবে সে কষ্টেরই হোক বা আনন্দের এর থেকে বড় উদযাপন জীবনে আর নেই।

সল প্যারাডাইজ বা ডিন মরিয়ারটি এত কাছের হয়ে উঠল কেন? বিদেশী কোনো চরিত্রকে এমন মনে হয়নি, রাসকোলনিকভের সঙ্গে আলাপ অসুখের বিছানায় শুয়ে, জেক বা স্যাম হেমিংওয়ের প্যারিসের সব দামালেরা বা পিয়্যের-এর মতো যুদ্ধ ও শান্তিতে  অবিচল কেউ আমাকে এভাবে বদলে দেয়নি। অথচ ওই হিচহাইকিংময় ওই নেশাময় ওই প্রেমময় আমেরিকান বিট জীবন আমাদের খুব সহজ নয় আপাতভাবে ( বুদ্ধদেব বসু সতর্ক করেছিলেন তার জামাইকে এদের সম্পর্কে) তবু কিছু একটা ভিতরের মিল ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি মানুষটা খানিক তেমন? না, শুধু তা নয় সময়টাও তো ছিল তেমনই। নব্বইয়ের দশকে কলকাতায় বেড়ে ওঠা যেখানে বিশ্বায়নের খোলা হাওয়া বইতে শুরু করেছে আর তার মাঝে শহরতলির এক মধ্যবিত্ত ছেলে নিজেকে খুঁজতে পারছে না সে একই সঙ্গে ওই ব্যবস্থার গিনিপিগ ও ভোক্তা কাজেই সে খুঁজে পাবে তার ছটফটানির সঙ্গে মিল সল বা ডিন-এর। নব্বইয়ের দশকে যারা এই নতুনের ঝাপটা পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি তাদের কয়েকজন সে আমার বন্ধু জয় বা কবি সোমাভ (যদিও অনেক পরে আলাপ) প্রত্যেকের মধ্যে এই না-থিতু ব্যাপারটা রয়ে গেল।

গোটা পৃথিবীতেই এমন রয়েছে, শুধু আমার দেশে নয়। বাইশ তেইশ বছর বয়সে প্রথম ট্রেক-এ যাচ্ছি, পাড়ার বন্ধু থেকে চায়ের দোকানের কর্মচারী নিয়ে সে এক আজব দল, ট্রেনে আলাপ হল একটি চেক ছেলের সঙ্গে সেও যাচ্ছে পাহাড়ে এবং স্যান্ডো আর হাফ প্যান্ট পড়ে দাঁত মাজতে মাজতে সে বললে তার এই আসাটা অন দ্য রোড পড়ার দৌলতেই। বুঝলাম আমি একা নই, এখনো অনেকেই মজে।


এই সল প্যারাডাইজ বা দিন মরিয়ারটি এরা ঠিক উনিশ শতকী বোহেমিয়ান নয়, শিল্পের জন্য ঐকিক যাপন চাই তাই ভেবে তারা এমন জীবন বেছে নেয়নি, তারাও তো আমাদের মতো একটা হাই ক্যাপিটালিস্টিক সমাজের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে ছিল। তাই বেছে নিয়েছে মুক্তির উপায় হিসেবে একটা খোঁজ যা ভিষণ শারীরিক বং মানসিকও। তারা দর্শনের ভিতর ঢুকে দেখতে চেয়েছে, তারা মহাদেশ এফোঁড় ওফোঁড় করে দেখতে চেয়েছে।  তাদের খোঁজে তাই কোনো বাঁধা নেই বুদ্ধের দর্শন থেকে বাম রাজনীতি সবের চর্চাই রয়েছে সলের বন্ধু র‍্যেমি যখন তার জেলখানার মেস থেকে খাবার চুরি করে বা ডিনরা আমেরিকার এপিঠ থেকে ও পিঠ যাওয়ার পথে দোকান থেকে খাবার সিগারেট বিয়ার ঝেঁপে দেয়  তা একধরনের অসহায় অবস্থার বিরুদ্ধে, কনভেনশনালিটির বিরুদ্ধে জেহাদ। জাঁ জেনের মতো পবিত্র চোর না হলেও ডিনের বড় হয়ে ওঠা জেলখানা আর লাইব্রেরি আর পুল হল-এ। আমরা আমাদের মধ্যবিত্ত গণ্ডীর ভিতর হাঁপাতে হাঁপাতে বা সয়ে যেতে যেতে বুঝতে পারি না, কিন্তু এই প্রত্যাখ্যান আমাদের কাছে নতুন নয়। মুশকিল হল আমাদের প্রত্যাখ্যানের রঙ গেরুয়া। মানে, না বললে সবকিছুকে, সন্ন্যাস নিতে হবে যেন শ্রীকান্তর মতো চরিত্রকে আমরা তাই বুঝতে পারি না, বা হয়তো নেশারু হিপস্টার শরৎ চাটুজ্জে একটা মেলোড্রামার আড়ালে ব্যাপারটাকে রেখে দিয়েছেন কিছুটা যাতে সহজপাচ্য হয়।

চরকিবাজি আর বোহেমিয়ানিজম-এর সহজ চশমায় শুধু দেখলে অবশ্য অনেককিছু হারাতে হতে পারে অন দ্য রোড তাই ধর্মা বাম ছাড়া পূর্ণ নয়। নীলের সঙ্গে অবিরাম ঘুরে যাওয়া নয় স্নাইডারের জেন বুদ্ধধর্ম ও তার শান্ত সমাহিত হাইকু চর্চা, তার যাপনের বাহুল্যকে বাদ দিয়ে একটা নান্দনিকতা তৈরি খুব খুব জরুরি। উদযাপন কী তা বুঝতে গেলে একইসঙ্গে যাপনের নানা দিক জানতে হয়। শুধুমাত্র রিক্ততার চর্চা দিয়ে হয় না, ও কবির কাজ নয়, লেখকের অভীষ্ট নয় বরং দুই প্রান্তকে নিজের মধ্যে দিয়ে মিলিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এমনকি তার ব্যর্থতা থেকেও সৃজন সম্ভব। ক্যেরুয়াক থেকে প্রথম আমি বুঝতে পারি সহজে।

অনেক পরে যখন ড্রিমার্স দেখি, সেই বিখ্যাত শেষ দৃশ্য যেখানে তিন বন্ধু প্রায় আত্মহত্যা করতে শুয়ে এমন সময় প্যারিসের রাস্তায় বিশাল মিছিল আর তারাও তাদের ব্যক্তিগত যাপনের ওই ওঠাপড়ার পরও মিশে যাচ্ছে তাতে, মলোটভ ককটেল হাতে প্রতিরোধের যুদ্ধে সামিল হচ্ছে। ষাটের এই যৌবনের বিদ্রোহ সম্ভব বিট মুভমেন্টের জন্যই।

আমাদের সমস্যা হল এই সহজ মিশে যাওয়াটা যে মানুষেরই তা বুঝতে শিখিনি তাই বিটদের নিয়ে আনেক ভুল ধারণা রয়েছে এমনকি প্রগতি সাহিত্যও এদের পছন্দ করে না, কারণ সদর দফতরে কামান দাগাটা প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করে। আমাদের প্রগতিশীলতার দর্শনও বহুদিন এই প্রতিষ্ঠান তৈরির চক্করে পড়ে রয়েছে। সর্বত্র হাই আর্ট হাই কালচারের বিরুদ্ধে একই রকম কিছু তৈরির চেষ্টা, বিপ্লব বা প্রতিরোধ মানে এক অদ্ভুত বামুনপনা যেখানে মানুষের স্বাভাবিকতার জায়গা নেই সে হাসতে ভালবাসতে উদযাপন করতে পারবে না জীবনকে । সে চেষ্টা জলে গেছে দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু অন দ্য রোডের মুক্তির ডাক এখনো শাশ্বত। সরাসরি মানুষে মানুষে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলা যায় এখনো এ বিশ্বাস রাখা যায়।


এও কী প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়নি? আমার এ যৌবনের মুগ্ধতা প্রায়-চল্লিশে পৌঁছে কেন?  সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু হয় কিন্তু চট করে হজমও হয় না। এই পৃথিবীতে বাজার আর ব্র্যান্ড অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে, তাই জিনস পন্য, তাই ব্রোম্যন্স বলে অদ্ভুত ন্যাকামির কনসেপ্ট তৈরি হয়। তার জন্য অন দ্য রোড দায়ী? কই যখন পড়ি মনে হয় না তো, লোকগুলো আমার মতোই গরিব বা মধ্যবিত্ত তারা ব্র্যান্ড তৈরি করেনি, জিনসের বাজার করেছে। তারা সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ওপেন সেক্সের কথা বলেছে তারা ব্রোম্যান্স নয় তারা সরাসরি সমকামী বলতে কুণ্ঠা বোধ করেনি। বুজোর্য়া বাজার সংস্কৃতি তাকে কোনোদিনই তাই হজম করতে পারবে না পুরোপুরি। তার কিছু কিছু জিনিস তারা নেবে চেষ্টা করবে গুলিয়ে দিতে তাদের জ্যাজ আর বেবপ প্রেম আজ হয়তো রক ব্যান্ডের হাজার হাজার টাকার টিকিটে বদলে দেবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও প্রতিরোধও থাকবে একটা জ্যাক ক্যেরুয়াককে নীল ক্যাসিডি থুড়ি সল প্যারাডাইজকে ডিন মরিয়ারটি বলবে চলো বেরিয়ে পড়ি, আর কার্লো মার্কস বা অ্যালেন গিনসবার্গ বারোজের মরফিন নেওয়া দেখতে দেখতে শোনাবে কাদিজ। এমনটা ঘটবেই বলে নীল ক্যাসিডির গাড়ি থেকে নামতে পারলাম না আর।

 

অন দ্য রোড

জ্যাক ক্যেরুয়াক

প্রথম প্রকাশ: ১৯৫৭         

Saturday, August 30, 2025

কোনো কিছুই কিছু না – উডি আ্যালেনের আত্ম-জীবনী

 


বই রিভ্যু নামক জিনিসটা কাঁচা বয়সে করার একটা অহেতুকী উত্তেজনা থাকে, প্রাগ্রসর কোনো লেখকের লেখা নিয়ে নিজের মত সবাইকে জানাচ্ছি ও তার ভাল মন্দের নিয়ামক যেন আমিই এই মজাটা বড় কম নয়, এবং সে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাওয়াটা দরকারিও, যদিও তারপর রিভ্যু করে ব্যর্থ লেখকেরা, তেতোমুখে সাংবাদিক ইত্যাদি ধরনের প্রাণী, আর নয় উপরোধের ঢেঁকি গিলে কেউ
যেমন আমি করছি এখন। বাংলায় পেশাদার সমালোচক হয় না, কালেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লোকে সমালোচক ভাবে, যদিও পেশাদার সমালোচক ব্যাপারটা আলাদা। তা বাংলায় সেটা নেই কেন? এ বিষয়ে আমি খুব জানি তা নয়, জানলেও মুখ খুলব না, মোদ্দা কথা হল সে-সবের অভাবে এই যে লেখাটা লিখছি তা প্রায় কেউই পড়বে না আমি নিশ্চিতএকটা ভাল ব্যাপার হল আমার কোনো লেখাই খুব বেশি লোক পড়েটড়ে না, তবু আশা যদি বা থাকে মেরা নাম্বার আয়েগা অন্য লেখার ক্ষেত্রে এ রিভ্যুয়ে নেই। তাও সম্পাদক ছোকরা মহা

আশা নিয়ে বলেছে, ভেবেছে আমি লিখলে দু-একজন পড়তে পারে, আর আমারও একখান বই সদ্য পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে দু-কথা লিখতে পারব তাই শুরু করে দিলাম। বইটি উডি অ্যালেনের আত্ম-জীবনী
অ্যাপ্রপোস টু নাথিং।

বার্নার্ড শ একবার লিখেছিলেন সমস্ত আত্মজীবনীই হল ঢপ, অসেচতন ঢপ নয় জেনে বুঝে মিথ্যে কথা লেখা। এখন শ-সাহেবের কথাটা মেনে নিই বা না নিই আত্মজীবনী ব্যাপারটা পড়তে মন্দ লাগে না যদি সে লেখা হয় রসিকের। অবশ্যই আপনি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, আমার জীবনই আমার বাণী মার্কা যত ছোটদের নিমপাতা গেলানো আত্মজীবনী যদি পড়ে থাকেন তাহলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হতে পারে আত্মজীবনী কেউ ওয়ার্ল্ড কাপে মেসি বনাম রোনাল্ডো বা নতুন বেরনো দীপিকা পাড়ুকোনের সিনেমা ফেলে পড়তে পারে কিন্তু তা সম্ভব। বিশেষ করে বইটির লেখক যদি হয় উডি অ্যালেন ও লেখার ঢং অননুকরণীয় উডি। তার কারণ উডি অ্যালেন শুধুমাত্র একজন সিনেমা-পরিচালক নন, একজন কমপ্লিট এন্টারটেইনার এমন একজন চ্যাপলিনের পর আমেরিকায় বিরল। আপনারা যারা উডি অ্যালেনের সিনেমা দেখেছেন তাঁরা জানেন উডি কীভাবে একইসঙ্গে সিরিয়াস কথার সঙ্গে গেঁথে দেন একেবারে ব্যক্তিগত একসেন্ট্রিসিটি, কীভাবে কোনো সিরিয়াস বিষয় হয়ে ওঠে ফ্রিভোলাস, ফ্রিভোলাস হয়ে ওঠে সিরিয়াস, এ ব্যাপারটা সবার হজমের নয় বিশেষত বাংলায় একে সিরিয়াস শিল্প হিসেবে ধরতে টরতে কেউ পারে না, লেখক-শিল্পী ইত্যাদি মহা স্ট্রাগল করে মরে-টরে না গেলে এবং দাঁতে-দাঁত-চেপা দুঃখ দুর্দশার কথা ও আগামীর বৈপ্লবিক ভোরের কথা না লিখলে তাকে ভাঁড় ছাড়া খুব কিছু ভাবা হয় না, এমনকি মুজতবা আলীর মতো লেখকও তাই রম্য রচনার লেখক হিসবে পরিচিত থাকেন এ হেন পরিস্থিতিতে উডি অ্যালেন-এর বিশাল সংখ্যক দরদী দর্শক এখানে থাকবে মনে হয় না, যদি বা থাকে তারা বাংলা ভাষা পড়েনটরেন বলে মনে করি না, বাংলা অর্নাস ছাড়া কারাই বা পড়তে যাবে এ-সময়ে, সে যাই হোক যদি উডির সিনেমা-রসিক কেউ এই লেখাটা পড়তে থাকেন তো বলি এ একেবারে কুইটিসেনশিয়াল উডি অ্যালেন। চ্যাপলিনের  আত্মজীবনী পড়ে সত্যজিৎ রায়ের ভাল লাগেনি, ওঁর মনে হয়েছিল চ্যাপলিন প্লেইং টু গ্যালারি করছেন শেষের দিকে, যেখানে উনি চ্যাপলিন হয়ে উঠেছেন তারপর শুধু সেই কার সঙ্গে কী কথা হল তার বর্ণনা। কথাটা অমূলক নয়, এবং সেই ফাঁদ থাকেই যে সাফল্যের পর একটা সেলিব্রিটি গোষ্ঠিতে আপনে-আপ লোকজন চলে যায় ও তা নিয়ে কথাও বলেন। উডির ক্ষেত্রে সেটা প্রথম থেকেই হতে পারত, উডি সেটার বাইরেও বেরননি, কিন্তু যেটা করছেন তিনি তার আশপাশের মানুষগুলোকে নিয়ে লিখেছেন যে স্বরে তাঁর প্রতিবিম্বরা সিনেমায় কথা বলে। ফলে সে তাঁর ডায়নি কিটনের সঙ্গে প্রেমই হোক আর প্লে বয়ের মালিক হিউ হেফনারের সঙ্গে যোগাযোগ সবই এত মজার ঢঙে লেখা যে পড়তে পড়তে মনে হয় না যে আপনি যে চরিত্রগুলোর কথা শুনছেন তাঁরা বিশ শতকের দুনিয়া কাঁপানো নাম। কারণ উডির মতে তার কিছু এসে যায় না, যেমন অস্কার পাওয়ার দিন তিনি কোডাক থিয়েটারে না গিয়ে নিজের বাড়িতে বসে কাজ করেন ননচ্যালান্টলি ঠিক তেমনি, ওই যে বইটার নাম দিয়েছেন অ্যাপ্রোপস টু নাথিং।



তার মানে এই নয় যে বইটা স্রেফ ভাঁড়ামো, বরং মার্কিন মুলুকের কমেডি ও তার নানা ধারা উপধারা সম্পর্কে এই বই থেকে আভাস পাওয়া যায়, ফলে উডির সিনেমা-রসিকরা আরেকটু বেশি রিলেট করতে পারবেন তাঁর ছবির নানা চরিত্রের সঙ্গে, তাদের পশ্চাৎপট সম্পর্কে আরেকটু পরিষ্কার ধারণা হবে। জ্যাজ মিউজিকে শখ যাদের রয়েছে তাদের পাঁচের দশকের নিউ ইয়র্কের জ্যাজ ও ব্লুজ সিন সম্পর্কে বেশ কিছু অজানা তথ্য হাতে আসবে বইটা পড়লে। আর অবশ্যই সিনেমার কথা। আমেরিকা ইজ ইক্যুয়ালটু হলিউড যারা মনে করেন না অথচ সারাক্ষণ গ্যোদার-ট্রুফো-ভনট্রায়ার দেখে নখ কামড়াতে চান না তাদের জন্য এ বই অপরিহার্য্য। যারা নিউ ওয়েভের দু-একটা নাম বাদেও এর‍্যিক রোমার দেখেছেন, যারা সাং-সু-হং দেখে আনন্দ পান উডি অ্যালেন তো তাদের জন্য, তাঁর এই সিনেমা নামক এক খামোখা দৈত্যকে অছেদ্দা, তাঁর চিন্তাশীল ও কৌতূহলী মাথা যা সারাক্ষণ প্রশ্ন করতে থাকে ও সেই সব বিপ্রতীপ ভাবনাকেই কোনো একট শিল্প মাধ্যমে ধরতে চায়
তাই একটা অশেষ কথোপকথন চলে সিনেমায়, টুকরো ভাঙা কথার পিঠে কথা, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারা মানুষের অনেক কথা থাকে, সেগুলোকে ক্যালাইডোস্কোপের মতো নেড়েচেড়ে দেখার নামই শিল্প।  না হলিউডি গ্ল্যমার না মাথাটনটনে আর্ট ফিলম এই দুয়ের হাস্যকর চরমপন্থাকে কখনো ঠুকে, কখনো পাত্তা না দিয়ে, স্রেফ একটা মজলিশি আনন্দে গল্প বলার মজায় উডির মতো মানুষের আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখেন। একুশ শতকে এসে আমরা বুঝে গেছি কোনো বিশাল তত্ত্ব বা আদর্শ নয় বরং আমাদের খণ্ডিত সত্ত্বাই বেশ মাজাদর এবং সে নিয়ে খুশি থাকা ঢের ভাল। ফিডেল কাস্ত্রো, পিনোচেট বা ইদি আমিন কোনোটাই খুব ভাল ব্যাপার নয় এবং সে-সবের বদলে বরং উডির নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, খানিক হ্যালভ্যালে খানিক বিরক্ত নিউ-ইয়র্কার ঢের ভাল এ আমরা বুঝে গেছি যারা এ বই তাদের জন্য। আর সত্যি বলতে কী আমার এই প্রায় হাজার খানেক শব্দ খরচ করে লেখাটা যারা পড়ে ফেললেন, আমার মন বলছে তাঁরা উডির বইটাও কোনো না কোনোদিন ঠিক পড়বেন। যদি বা নাও পড়েন ক্ষতি নেই এই লেখা থেকে গোল গোল করে বলে দিলে আপনি বইটা পড়েছেন আপনার আঁতেল বন্ধুরা ধরে নেবে।            



Tuesday, August 26, 2025

শক্তিরূপেণ ভাষাস্থিতা

 

আসলে ব্যাপারটা ভাষার কারবার। ভাষা সাহিত্যের কাঁচামাল মাত্তর নয়, তার উৎপাদিত পণ্যও বটে, এখন এর বাইরে আরও কী কী বোঝায় সাহিত্য বলতে, তা নিয়ে অনেক টাক ও টিকির লড়াই রয়েছে কিন্তু মোদ্দা কথায় সেগুলো হল এক রকমের বিশ্বাস যা মা কালী বা কার্ল র্মাক্স দুই দিয়েই পাকিয়ে তোলা যায়, সে নিয়ে একটা জীবনকাল কেন অনন্তকাল চলতে পারে। এ আমার অত্যুক্তি নয়। অনেক হুদো হুদো কেতাদুরস্ত সমালোচক এখনো সেই গ্রিক বাবাজি প্লেটো কী বলে গেছিলেন, নকলের নকল এবং আসল এক অবাস্তব সেই নিয়ে তুরীয় আনন্দলোকে পৌঁছে যান - আমি সে ধার মাড়াচ্ছি না। অত বুঝিনে, কাজ খতম বাত খতম, অব্যক্ত কী, আর শরীর গেলে তো সবই গেল কাজেই তার উপর আর কিছু আছে-টাছে এসব ধরতে পারিনি সোজা কথায় বুঝি সাহিত্য একটা ভাষা শিল্প।

উপরের ভূমিকাটা পড়ে কেউ ভয় পাবেন না, আমি সাহিত্যের স্বরূপ খুঁজতে বেরিয়েছি, তার জন্য ইউলিসিস অথবা বুরবক হতে হয়, যার কোনোটাই আমি নই, আমার বক্তব্য আমাদের বাংলা সাহিত্যের ভাষা ও তার শক্তি নিয়ে। সাহিত্য বলতে আধুনিক যুগে লিখিত ব্যাপার বোঝায় এক আবৃত্তি আর গান ছাড়া তার মৌখিক কোনো রূপ আর নেই, কাজেই তাকে মুখের ভাষা না ধরে একটা নির্দিষ্ট রূপ ধরাই ভাল, মানে যা ছেপে বা ডিজিটাল মাধ্যমে আমাদের সামনে আসে, অক্ষর যার মূল উপাদান, সঙ্গে আরো কিছু ধরনের চিহ্ন থাকে যেমন সংখ্যা, যতিচিহ্ন। এবং আমরা তাকে পড়ি, তা এই পড়া বলতে মনে মনে উচ্চারণ না একটা মনের ভিতর তৈরি হওয়া ছবি, শব্দ-ঝংকার, ভাবনা এই সবের মিশেলে একটা পড়া বলে জিনিস তৈরি হয়। এবার সেই পড়াটা তৈয়ের হয় শব্দ, ভাষা, ব্যাকরণ ইত্যাদি দিয়ে। আমার খোঁজ বাংলা সাহিত্যের সেই ভাষার শক্তি কেমন। আমার সময়ে বাংলা সাহিত্যের ভাষা যেখানে দাঁড়িয়েছে সেটা কতটা শক্তিশালী, তার কী আরো শক্তিবৃদ্ধি সম্ভব না তার লোল চর্ম দেখা দিয়েছে।

আধুনিক বাংলা লিখিত ভাষাটার শক্তি এবং দুর্বলতা এটাই যে সেটা পাঁচমিশেলি। উপনিবেশপূর্ব বাংলা ভাষার কোনো মান্য রূপটূপ ছিল না বলেই মনে হয়, সংস্কৃতের মতো গাদা গাদা ব্যকরণ লিখে তার গতিপথে বাঁধ দিয়ে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, ফলে এখনই একটা উপনদী মিশে গেল, তো তখনই চারটে শাখা বেরিয়ে পড়ল। কখন আরবি, ফার্সি এসে ঢুকে পড়ছে, কখন ঠেট বুলির সঙ্গে মিশে রাধা কৃষ্ণের পিরীতি কবিতা হয়ে উঠছে, একেবারে যাকে বিলাতি ভাষায় বলে অরগ্যানিক, আমরা বলি শুক্তোয় কী সবজি দিচ্ছো তা আসল নয়, তা খেতে কেমন হচ্ছে সেটাই আসল। সে বড়ো বালক বয়স, তখন ভাষা যা পায় তাকে দিয়েই নতুন নতুন সৃষ্টি করে যেমন বাচ্চারা যা পায় তাই দিয়ে খেলনা বানিয়ে খেলে। তা সে ডানপিটে ছেলে পন্ডিতের টোল এড়িয়ে, মৌলবির মাদ্রাসা এড়িয়ে কখনো রাজ প্রাসাদে, কখনো গ্রামে, কখনো আখড়ায় বড়ো হচ্ছিল সংস্কৃত, আরবি, ফারসি মিশে, মগ-হার্মাদের পাল্লায়, কখনো বাউল-তান্ত্রিকদের গুহ্য সাধনায় নিজের মতো। এরপর এল ইংরেজদের ইস্কুল, তাকে কান ধরে টেনে ঢোকানো হল, সেও বুঝল নবীন যৌবন এবার একটু বিষয় আসয়ে মন দিই, আর পাঁচজন সভ্য ভদ্রলোকের সঙ্গে মেলামেশা করার মতো হই। ব্যাস এল উনিশ শতক, এল নিজেকে গড়ার ধুম। গড়তে গেলে ছাঁচ লাগে কেউ ইংরেজের ব্যাকরণ বই খুলে বসল, কেউ সংস্কৃতে ডুব দিল, কেউ ভাবল মুখের ভাষাটাকেই সাজিয়ে গুছিয়ে দিই না কেন। এমন একটা ভাষা চাই যাতে কবিতাও হবে আবার নিউটনের সূত্রও হবে অর্থাৎ সে কলাখান সব ঘটেই বসবে, সবাই বুঝবে, তাতে ময়মনসিংহের লব্জও থাকবে না আবার বাঁকুড়াও ঢুকে পড়বে না। মান্য ভাষা।

শেষ পর্যন্ত সেই লিখিত ভাষা এল, যা অনেকটা সংস্কৃত নির্ভর। কাজটা সহজ হয়নি। শুরুর সময় থেকেই হুতোমই আর আলালী ভাষা তাকে রীতিমত বেগ দিয়েছে এবং এ নিয়ে ঝগড়াও কম হয়নি। বঙ্কিম স্বয়ং এতে মাথা ঘামিয়ে বললেন মধ্যপন্থাই শ্রেয়। সংস্কৃত পণ্ডিত আর নব্য লেখকদের এই ঝগড়ায় বঙ্কিম একেবারে পুরনোদের দিকে ঝুঁকে পড়লেন না কেন, এমনিতে ঐতিহ্যিক লোক হয়েও, তার কারণ আমার শাদা চোখে একটাই দিনের শেষে তিনি সাহিত্যিক, গপ্প উপন্যাস লিখতে গেলে গোটা সমাজ ধরতে হয় যদি কৃষ্ণচরিত্র আর ধর্ম লিখেই তাঁর চলত, অনেকটা এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মতো তাহলে উনি কখনওই সালিশি করতেন না নব্য লেখকদের হয়ে কিন্তু মুচিরাম বা কমলাকান্তর দপ্তরখানা লিখতে গেলে ওই টিকিওলাদের বাংলা দিয়ে শুধু চলে না।

ভাষার অনেকান্ত ব্যাপারটা তখনকার দিনের ইন্টেলেকচুয়ালরা বুঝতেন কাজ করতে গিয়ে, ঠেকে শিখে, কিন্তু মেনে নিতে পারতেন না বোধহয়। লিখিত ভাষার ক্ষেত্রেও সাহিত্য ও ব্যবহারিক এই দুইয়ের বিস্তর দূরত্ব। বিজ্ঞান বা সমাজ তত্ত্ব এসবের জন্য যে সাধারণীকৃত ভাষা লাগে তা সাহিত্যের জন্য নয় এটা জানলেও সরাসরি বুক ঠুকে বলা যেত না, কারণ ওই যে দেশ গড়া আর ভাষা গড়া সমার্থক হয়ে গেছে। ফলে হুতোমের নক্সা, আলালের লেখা, নিধুবাবুর গান কোনোটাই কলকে পেল না। ওগুলো রয়ে গেল চমৎকার ব্যতিক্রম। অথচ নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নগরায়নের সুন্দরতম ফসল সেই ভাষা। মুখের ভাষার শালা বাঞ্চত বাদ দিয়েও অশ্লীলতার দায় এড়াতে পারল নাকারণ ও বড়ো আভা গার্দ সেকালের কাছে, বড়ো বেআব্রু করে তোলে সেই সৌন্দর্য সাহিত্যে যে নেওয়া যায় সেই সাহস ছিল না।

কবিতা ও গদ্যের ভাষার সাহিত্যে মিশ্র ব্যাপারটা আগে থেকেই ছিল, ভারতচন্দ্রে উদাহরণে ভরপুর

এসেছি বিদ্যার আশে  যাইব রাজার পাশে

      সুকবি সুন্দর মোর নাম 

একেবারে এসেছি ও যাইব ব্যবহার করেছেন ভারতচন্দ্র ছন্দের খাতিরে এতে তাঁর দোষ ধরা হয়নি, কারণ টুলো পণ্ডিতরা বোধহয় জয়দেবের নিচে আর নামত না। সে যাক, এমন উদাহরণ প্রচুর। কিন্তু ঔপনিবেশিক কালে সেই গুরু-চণ্ডালি দোষ (এই শব্দ বন্ধ থেকেই বোঝা যাচ্ছে ঝোলটা কোন দিকে) বেশ ভাল মতই দোষের হয়ে উঠল। সাহিত্যের ভাষা প্রথমেই একখান ধাক্কা খেল এবং শক্তিক্ষয় ঘটল। এখন মনে হতে পারে কই সাধু তো নেই আর এই নেইটা তার থাকার একটা বড়ো প্রমাণ, তিনি গুরু তাই চণ্ডালে জল অচল, তাই চণ্ডাল ভাষা উরফ চলিত আসতেই তিনি আর এক পঙক্তিতে বসলেন না, বেমালুম হাওয়া হয়ে গেলেন। ব্যতিক্রম আছে লিরিক কবিতা রবীন্দ্রনাথও লিখেছিলেন এসেছিলে তবু আস নাই জানায়ে গেলেএই এসেছিলে আর জানায়ে যে পাশাপাশি বসল তা এক বিশাল শক্তি। এটা তারপর আর কেউ এভাবে পারল না। পারল না তার কারণও রবীন্দ্রনাথ, সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ নন, সব পেয়েছির দেশ রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথের এই কবিতার ভাষা প্রায় গিলে ফেলল বাংলা কবিতাকে, একটা লিরিক নির্ভর লোকায়াত বাংলার ভাষায় পালিশ মেরে সহজিয়াকে করলেন নাগরিক পরিশীলনে পরিণত এমনকি এতদূর এ বিষয়ে তাঁর মন কঠোর ছিল যে তিনি গ্রামীন ছড়ার সংকলন সম্পাদনা করার সময় যে সব শব্দ তাঁর কানে অশ্লীল লাগল দিলেন কেটে। শব্দ, ব্যকরণ, ভাষা শৈলী হয়ে উঠল রাবীন্দ্রিক। রবীন্দ্রনাথের সমসময় সেটা ছিল এক বৈপ্লবিক বিস্ফোরণ তা বুঝতে অসুবিধে হয় না, যে কোনো একটা গান নিয়ে তাঁর সময়ের সমাজকে কল্পনা করলেই বোঝা যায় তা কতটা হইচই ফেলতে পারে। ফেলেওছিল, তাঁর গানগুলোকে অশ্লীল বলে বাড়ির তরুণ তরুণীদের গাইতে দেওয়া হত না, যে গানগুলো আজ আমরা অনেকগুলোই পূজা পর্যায়ের গান বলে জানি এ কথা সুধীন দত্ত লিখে গেছেন। কিন্তু তখনও তিনি রবিবাবু, তখনও গুরুদেব হন নাই। এ যেন অনেকটা সেই বুজোর্য়া বিপ্লবের ইতিহাস। মানে, নিঃসন্দেহে তা সে সময়ের ক্ষেত্রে এক দারুণ ব্যাপার, কিন্তু পরে সেই বুজোর্য়াই মানুষের গলার উপর পা তুলে কী নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে তো দেখতেই পাচ্ছি।

ব্যাপারটা তিরিশের দশকের কবিরা ধরে ফেলেছিল। এবং তার থেকে বেরোনো দরকার এমন একটা ভাবনাও মাথায় তাদের আসেনি তা নয়। কিন্তু কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কোন জায়গা থেকে আক্রমণটা করবে বুঝতে নারি, যেন পড়লে চক্রবূহ্যের মধ্যে তাঁর কবিতার ভাবনাকে কাটবে, তাঁর ছন্দের সঙ্গে পাঞ্জা লড়বে, না তাঁর ভাষাকে দেবে উড়িয়ে? এ নিয়ে গলদঘর্ম। তাও রবীন্দ্রবিদ্রোহ হল একটা। তা সে জেহাদে য়োরোপের মর্ডানিস্টদের ইস্তিহার খানিক শক্তি দিল, ফলে সেই পালের হাওয়ায় বুদ্ধদেব, জীবনানন্দরা ভাসলেন। কিন্তু খটকাটা ছিল। সুধীন দত্ত যেমন, দেখলেন ভাবনায় বদল আসে সময়ের সঙ্গে কিন্তু প্রগ্রেসর বড়ো কবির সঙ্গে টক্কর হয় শেষ পর্যন্ত ভাষা দিয়ে, শৈলী দিয়ে ওখানে কেউ যদি ডুয়েল লড়ার আগেই, রণে ভঙ্গ দেয় তাহলে বাকি লড়াইগুলোয় পুরোপুরি বাগে আনা যায় না অগ্রজকেসুধীন দত্ত বুঝলেন এবং অভিধান, শব্দকোষ ঘেঁটে একটা নিজস্ব শব্দভাণ্ডার তৈরি করলেন, অনেক নতুন শব্দ জুড়লেনআমরা জানলাম কলা কৈবল্য কী, প্রতর্ক কাকে বলে, আরো জরুরি যা তা হল একটা ভাবনাকে বা চিত্রকল্পকে একটা শব্দের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে অভিধানের সাহায্য নিয়ে এভাবে একটা কবিতার ভাষা, যা অবশ্যই মুখের ভাষা থেকে দূরে কিন্তু স্বতন্ত্র। এ ভাষা সহজবোধ্য নয়, এর শক্তি বা সৌন্দর্য্য একেবারেই যাকে বলে সিলেক্ট ফিউ বা দিক্ষিত পাঠকের জন্য। এখন কবি বা কবিতার দায় কি সবটা জলবৎ তরলং করার? কিছু মানুষ তো অন্য তরলের মৌতাতেও থাকে। কিন্তু ওই সহজিয়া রবি ঠাকুর এমন সহজ ভাষার নেশা ধরিয়েছে যে জল খেলেই পাঠক আরাম পায়, আরেকটু কড়া তরলে মাথা ঘোরে। এ এক বিপদ, সুধীন দত্তর থেকে জীবনানন্দর কবিতার ভাবনা বোঝা ঢের কঠিন অনেক ক্ষেত্রে কিন্তু ওই ভাষার জন্যই জীবনানন্দ পড়ে কেউ বেতর হয় শুনিনি।

শব্দের ক্ষেত্রে এ কথা বললেও কবিতার ভাষার আরেক বড়ো দিক হল ছন্দ, সেক্ষেত্রে সুধীন দত্ত স্বীকার করে নিলেন ওতে রবীন্দ্রনাথ অনতিক্রম্য। যদিও এমন নয় গৈরিশ ছন্দের উদাহরণ তাঁদের হাতে ছিল না, বা গদ্য কবিতা দিয়ে এক নতুন কাঠামো তৈরি করা যেত না। কিন্তু তত দূর হয়তো পৌঁছয়নি সুধীন প্রতিভা। জীবনানন্দ বরং পয়ারকে লম্বা টেনে আট মাত্রার সঙ্গে চৌদ্দ, আঠারো মাত্রা জুড়ে খানিক চেষ্টা পেলেন। ফলে সেদিক থেকে পয়ারে লেখা কবিতা গদ্যের দিকে গেল। এই গদ্য কবিতায় লুকনো একটা পয়ার চাল দেখা গেল এটা পরে অনেক কবি ব্যবহার করেছেন। তবে ওই সুধীন ভাষা একটা নিঃসন্দেহে কবিতার ভাষায় শব্দযোগের এক নতুন প্রণোদনা। কিন্তু ওই যে সুধীন একমাত্রিক রয়ে গেলেন, তাঁর ভাষার সঙ্গে অভিধানের যত মিল শ্যামবাজারের লব্জের সঙ্গে সম্পর্ক ততটাই অমিল। সেই মাইকেলিই হয়ে গেল ব্যাপারটা, ফলে সুন্দর ব্যতিক্রম রইলেন। 

এখন এটা সর্বতো সত্যি যে সাহিত্যের ভাষা মাত্রই মেকি, বানানো, কারণ তা চলে বাচ্যালংকারে। সোজা ভাবে বললে, যে সাহিত্যে কী বলছে তার সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে বলছে বা লিখছে। এখানেই আসে রেটরিক বা অলংকারশাস্ত্রের কথা। এখন এই রেটরিক জিনিসটা স্কুল কালেজে পড়া নিয়ম কতগুলো ধরে নিলে তা নেহাত যান্ত্রিক একখান ব্যাপার হয় আসলে এর একটা উদ্দেশ্য আছে তা হল যে পড়ছে লেখাটায় তাকে আকর্ষণ করে রাখা, তার মনে নানা ভাব ও অনুভূতি তৈরি করা এর জন্য শুধু কতকগুলো অলংকারের নিয়ম যথেষ্ট নয়। তাই শব্দের ব্যবহার ও তার সীমানাকে বারবার বাড়িয়ে নিয়ে যেতে হয়। এখন কবিতা নিয়ে যে সব কথা বললাম তার সুবিধে হল কবিতা বিষয়টা এমনই যে তার প্রয়োজন আধুনিককালে সাহিত্যের বাইরে নেই, কোনো প্রাচীন যুগে দর্শন, ধর্ম, মঙ্গলকাব্য নামের আখ্যান সাহিত্য সমালোচনা সবই কবিতা নামের এক ব্যাঙ্কের জমাখাতায় উঠত, কিন্তু আধুনিকের অত সাহস নেই, ফেল পড়ার ভয় আছে, তাই তার থেকে পুঁজি সরিয়ে নিয়েছে। কবিতায় গত শতকের অনেক কবিকে পাওয়া যাবে, সে তুষার রায় বা অনন্য রায় হোন বা প্রসুন বন্দ্যোপাধ্যায় ও গৌতম চৌধুরীরা, জনপ্রিয়তার আলোকসম্পাতের বাইরে থেকে লিখেছেন বা লিখছেন এখনো। কিন্তু বাংলা গদ্য সাহিত্য নিয়ে কথা বললে খানিক জটিল হবে ব্যাপারটা।

আগেও লিখেছি, গদ্যের একটা মান্য ভাষার দায় আছে সে দায় আসে সর্বাধিক জনের কাছে যাতে পাঠ্যবস্তুর অর্থ সহজতম উপায়ে পৌঁছয়। ফলে একটা মান্য ভাষা লাগে, যা বাঁকুড়া থেকে বরিশাল সবচেয়ে সহজে বুঝতে পারে। আমাদের গদ্যে সেই ভাষা একটা বিশেষ অঞ্চলের ভাষার থেকে নেওয়া, মূলত নদিয়া-নবদ্বীপের। তার নানা কারণ রয়েছে, সে নিয়ে বিতর্কও আছে, সে ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী যে যুক্তি দিয়েছেন তা খানিকটা ভাবার নানা উপভাষার মধ্যে যে উপভাষার ব্যবহারিক দিকে বর্ণের সংখ্যা বেশি এবং স্পষ্ট তাই কালে দিনে মান্য ভাষা হিসেবে অন্য ভাষার থেকে যোগ্য হয়ে ওঠে এবং তাতে অঞ্চলভেদে সর্বাধিক লোকের সবচেয়ে সুবিধে হয়। এবং অবশ্যই ব্যবহারিক ভাবে একটা মান্য ভাষার প্রয়োজনও। প্রশ্নটা হল সাহিত্যের কি অন্ধের মতো তার পিছু নেওয়ার দরকার রয়েছে?

আবার একটু পিছিয়ে গিয়ে দেখা যাক আধুনিক বাংলা গদ্যের উৎস। আগেই লিখেছি সে একটা ভীষণ সাড়া পড়ে গেছিল ভাষা তৈরির বা সংস্কারের এবং আজকের ভাষায় যাকে বলে কর্মকাণ্ডে জুড়ে গেছিলেন অনেকে এবং অনেকান্ত উদ্দেশ্যে। যদি একদলের লক্ষ্য ছিল শিক্ষার ভাষা হিসেবে তাকে মজবুত করা তো অন্য আরেকদল খবরের কাগজ অর্থাৎ তথ্য-জ্ঞাপনের জন্য ভাবলে, আবার একদল চাইল নীতি শিক্ষা মাতৃভাষায় হওয়া ভাল তো আরেক দল চাইলে সাহিত্যের ভাষা হোক বাংলা সব মিলিয়ে যাকে বাংলার রেনেসাঁস বলে তাতে দ্রুত মাতৃভাষা বাংলা লিখিত ভাষা হিসেবে সংস্কৃত এবং আরবি ফারসির জায়গা করে নিল, যেমন হয়েছিল য়োরোপীয় রেনেসাঁসের সময়েও। মিখাইল বাখতিন, তাবৎ বিশ্বে যিনি সাহিত্য, ভাষা, স্বর ইত্যাদির দিগগজ বলে পরিচিত, তাঁর মত ছিল য়োরোপের রেনেসাঁস নিয়ে

A single national language did not exist yet; it was being slowly formed. The process of transferring the whole of philosophy to the vernacular and of creating a new system of literary media led to an intense inter orientation of dialects within this vernacular but without concentration at a center.

এখন এ জিনিস একটা ভাষার যৌবনকালে সম্ভব হলেও মাঝবয়সে এসে সে আবার ওই কেন্দ্রিকরণের দিকে হেলে যায় তা বাখতিন সাহেব যতই বলুন না কেন বিলাতের দেশগুলোতেও দেখা গেছে একখানা স্ট্যান্ডার্ড ভাষারূপের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল সবাই, এবং প্রাথমিক ওই খোলা গণতান্ত্রিক জায়গা থাকলেও সেটা ক্রমশই একাদেমি ও অনুশাসনপন্থীদের হাতে চলে যায়। বাংলার ইতিহাসটাও একই যদিও বলা যেতে পারে একটা সংক্ষেপ বা গবেষণাগার নমুনা। খোদ রামমোহন প্রথমে ফারসি ভাষায় লিখতে শুরু করেন থেকে বোঝা যায় যে দেশীয় সরকারি ভাষা হিসেবে তখনও বাংলা তৈয়েরই ছিল না। এরপর কী দ্রুত আমরা পৌঁছে যাচ্ছি বাংলায়, ফোর্ট উইলিয়মের পণ্ডিতদের পেরিয়ে, মদনমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমারের হাত ধরে এ এক আশ্চর্য ইতিহাস। সে যুগে বাংলা গদ্যও নতুন নতুন প্রয়োজনে তৈরি করে নিচ্ছিল নতুন নতুন সব পথ। এখন শতাব্দীর দূরত্বে ভাল খারাপের বাহাসে তাল ঠুকে লাভ নেই বরং সেই পথগুলো চিহ্নিত করা যাক। এই যে বটতলায় মুদ্রনের ইতিহাসের শুরু তাতে পাঁজি থেকে উপদেশাবলী থেকে নক্সা, কবিতা, উপন্যাস সবই বেরুচ্ছে তার বিভিন্নতা আশ্চর্য করে। ভাষাগত কোনো হোমোজিনি বা সমসত্ব তার মধ্যে আদৌ নেই। আলালী ভাষার সঙ্গে ভুবন মুখুজ্জের হরিদাসের গুপ্তকথার পার্থক্য রয়েছে, তেমনি পার্থক্য বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাসে। এই বহুমুখি ভাষা একটা বিরাট শক্তি একজন সাহিত্যিকের কাছে যিনি প্রয়োজন মতো তাঁর শব্দ ও শৈলীর রসদ সংগ্রহ করতে পারেন এখান থেকে। ব্যাপারটা বঙ্কিমচন্দ্র ভালই বুঝেছিলেন....

কিন্তু লিখিবে বললেই কী আর লেখা হয়? বাঙলায় এক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদয় হতে শুরু করে যা ভদ্রলোকী বাঙালীর নামে তার সাহিত্যের ভাষা থেকে ধার মুছে দেবে এই নিয়তি স্বয়ং বঙ্কিম বা রবি ঠাকুরেরও জানা ছিল না। অথচ তখনও লড়াই ছিল সাধু বনাম চলিতের, সেই বড়োর লড়াইয়ের তলায় আসলে কী চাপা পড়ল আরো গুরুতর জিনিস তা হল উপভাষার ব্যবহার, বাংলা শব্দের যে আবহমানের স্বাভাবিক বিবর্তন সেইগুলো। এই যে বঙ্কিমচন্দ্র ভাষা নিয়ে পুরো একটা প্রতর্ক তৈরি করছেন বাংলা গদ্যের সাপেক্ষে কারণ তিনি জানতেন যে বাংলা কবিতায় ভাষাগত কোনো বিভেদ নেই ফলে তা চিরকালই শক্তিশালী, কোনো একদেশদর্ষী মনোভাব তাতে ছিল না। বঙ্কিম গদ্যকে সভ্যতার উন্নতিতে বেশি কার্য্যকরী বলে পাশ কাটালেও কাব্যভাষার অভিমুখ তাঁর চোখ এড়ায়নি। ... বাংলা কাব্যে কথিত ভাষাই অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হইত এখনো হইতেছে। বোধ হয়, আজি কালি সংস্কৃত শব্দ বাংলা পদ্যে পূর্ব্বাপেক্ষা অধিক পরিমাণে প্রবেশ করিতেছে; চণ্ডিদাসের গীত এবং ব্রজাঙ্গনা কাব্য অথবা কৃত্তিবাসি রামায়ণ এবং বৃত্রসংহার তুলনা করিয়া দেখিলেই বুঝিতে পারা যাইবে। এ মত যে লেখকের মাথায় ঘুরছে তার যে টনটনে জ্ঞান ছিল বলে দিতে হয় না, আর তাই বহু বছর পেরিয়ে সন্দীপন চট্টপাধ্যায়ও মুগ্ধতা প্রকাশ করেন বঙ্কিমে।

ভাষার লড়াইটা তাই শুধুমাত্র সাধু ও চলিতের লড়াই হিসেবে দেখলে তা একরৈখিক দেখা হবে। প্রমথ চৌধুরী যে মুখের ভাষায় লেখার কথা বলে, তাঁর যে বীরবলীয় সাহিত্য সেটা শুধুমাত্র ক্রিয়াপদের চলিত রূপ ব্যবহারের জন্য না, তিনি চেয়েছিলেন পণ্ডিতি শব্দকে সসম্মানে বিদেয় করে বহু সংখ্যক ইতর শব্দকে বরণ করে নিতে। তাঁর মতামত স্পষ্ট ছিল ভাষা জিনিসটা কোনো একটি বিশেষ ব্যক্তির মনগড়া নয়, যুগযুগান্ত ধরে একটি জাতির হাতে গড়া। কেবলমাত্র মনোমত কথা বেছে নেবার, এবং ব্যাকরণের নিয়ম রক্ষা করে সেই বাছাই কথাগুলিকে নিজের পছন্দমত পাশাপাশি সাজিয়ে রাখবার স্বাধীনতাই আমাদের আছে এই যে শব্দ বাছাই ও তার সাজানো এই সাহিত্য, এই ভাষার শক্তি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের এই সাধু ছেড়ে চলিত ভাষায় পৌঁছতে সময় লেগেছিল, বউঠাকুরাণী থেকে শেষের কবিতার ভাষা একটা বিস্ফোরণ। যদি রবীন্দ্রনাথের প্রতি ব্যক্তিগত একটা অভিযোগ থাকে তা হল তিনিও একটা ধারালো জায়গায় পৌঁছলেন কিন্তু তা তাঁর সাহিত্যের মূল ভাষা হল না। ছিন্নপত্রের ভাষা। রবীন্দ্রনাথ অত সুন্দর গদ্য আর কখনোই লেখেননি, কলকাত্তাই ভাষার সঙ্গে জুড়ে গেছে কাব্যিক তৎসম শব্দ অবলীলায়, তার শব্দ দিয়ে ইমপ্রেসনিস্টিক বর্ণনা এখনও আমাদের আয়ত্ত্বে এল না, কারণ তিনিও এটাকে মূল ভাষা করলেন না। দুটো উদাহরণ না দিয়ে আমিও পারছিনে সেই তিন হাজার গির্জ্জের চুড়ো, কলের চিমনি, জাহাজের মাস্তুল নীল আকাশে যেন গুঁতো মারতে উঠেচে, কলকাতা তার সমস্ত লোষ্ট্রকাষ্ঠ দিয়ে প্রকৃতিকে গঙ্গা পার করেছে..... এই খানে লোষ্ট্রকাষ্ঠ শব্দটা যেন আইজেনস্টাইনের ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ, এরেই তো বাছাইসাজানো বলেছেন প্রমথ চৌধুরী। আবার দেখি ..আবার আমার সেই পর্দ্দাটানা ঘোমটা-দেওয়া ঘরটি মনে পড়চে। - কিন্তু কোথায় আপনি, কোথায় আপনার সেই ছাতা, পাপোষ-শয্যায় শয়ান সেই পুরাতন জুতোযুগল! আমার সেই হৃষ্টপুষ্ট বিরহিনী তাকিয়া সে কি আমাদের বিরহে রোগা হয়ে গেছে, আমি তাই ভাবচি এই বর্ণনা, এই যে ঘোমটা-দেওয়া ঘরের চিত্রকল্প বা তাকিয়ার এই যে পাপোষ-শয্যায় শয়ান এ একই সঙ্গে ছবিতে যেমন অসামান্য তেমনি কানের ভিতর যে শ্রুতি-সৌন্দর্য্য (অউরাল অ্যাসথেটিক্স) তৈরি করে, একে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করলেন না খুব একটা!

বাংলা ভাষায় গত শতকের প্রথম দিকে রবীন্দ্র-প্রভাব সত্ত্বেও গদ্যে কিন্তু দেখা গেছে আশ্চর্য সব ধুরন্ধরদের। ত্রৈলক্যনাথ, রাজশেখরদের ভাষা যে-কোনো সময় মুগ্ধ করতে পারে। ছিলেন সুকুমার রায়। রবীন্দ্রনাথের শৈলীর কাছাকাছি থেকেও মুজতবা আলী এক বিস্ময়। সৈয়দী ভাষা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই, শুধু একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে সায়েবের মুখ সেদ্ধ-হ্যামবর্ণ: সেটা লিপস্টিক হল কি না বুঝতে পারলুম না... এই যে সেদ্ধ-হ্যামবর্ণ শব্দটাও আর বাংলায় ছিল না, কিন্তু একটা উপমা যে কীভাবে নতুন শব্দ তৈরি করতে পারে তার উদাহরণ পাওয়া গেল। এমন ভুরিভুরি উদাহরণ মুজতবা আলীতে। এখন অনেকের ধারণা এ শুধু মজলিশি আড্ডায় চলে অথবা রম্য রচনায়  আলী সাহেবের একটা উপন্যাস আছে সিপাহি বিদ্রোহের পটভূমিতে সেটা একবার পড়ে দেখলে এ প্রমাদে থাকতে হয় না।

এ সত্ত্বেও বাংলা ভাষার দুর্ভাগ্য যে তা একটা তরল খবরের কাগুজে সাহিত্যের ভাষায় পরিণত হল। তাতে না রইল প্রাণ না রইল সৌন্দর্য্য। এর জন্য দায়ি সাহিত্য নামে প্রচলিত কিছু জনপ্রিয় গল্প, উপন্যাস ও তার প্রবল প্রচার ব্যবস্থা বাংলা সাহিত্যে আগে যা দেখা যায়নি। সেই ড্রামপিটিয়ে গোষ্ঠী ঘোষণা করলে আমাদের লেখা না পড়লে পিছিয়ে পড়তে হয় এবং তাদের উপর চালাক একের পর এক ডন করলিয়নি-সম লেখকবৃন্দ প্রমাণ করতে চাইলে বাংলা গদ্যের ছাঁচ এক, এমনকি তাদের মধ্যে কেউ নাকি কমলকুমারের চেলা আছিল হায় কমলবাবু আপনার গুহ্যদেশ তাহারা বাঁচাইতে না পারিলেও ভাষাটির সে অঞ্চলের দফারফা করে দিয়াছে এবং এর ফলে নিজস্ব ভাষা ও শৈলীর লেখকেরা নেহাতই নিরীক্ষামূলক অপর রয়ে গেল, এবং বহু লেখকও ভাষার শক্তি পরীক্ষার জায়গাটা এড়িয়ে গেলেন। ফাল্গুনী রায় বা তুষার রায়ের গদ্য নেহাত আন্ডারগ্রাউন্ড সাহিত্য, হাংরি ইত্যাদি হিসেবে পরিচিত রয়ে গেল। সন্দীপন তাঁর প্রথম দিকের ভাষা ছেঁটে ফেললেন কোন প্রণোদনায়, আজ কাল পরশুর কাগুজে অস্তিত্ব তার জীবনে স্বস্তি দিলেও বনসাই করে ফেললে হয়তো তাঁর ক্ষমতা।

 গত-শতকের সত্তর ও আশির দশক থেকে এই জুলুম বাংলা ভাষা সহ্য করেছে, এবং এই মধ্যবিত্ত-পাচ্য সহজ ভাষা ক্রমশ বাংলা ভাষার শক্তিক্ষয় করেছে। অপ্রয়োজনে বাংলা শব্দ হটে গিয়ে তার জায়গায় হিন্দি বা ইংরেজির মতো ভীনদেশি শব্দ চলে আসছে। আমরা বিজলি বাস, বেতনের বদলে ইলেক্ট্রিসিটি বা স্যালারি বলতে স্বচ্ছন্দ। এ সমস্যা বাংলার নতুন নয়, ধরুন নাস্তা, ছোট হাজরি, জলখাবার কত শব্দই আছে তবু আমরা একটা বিলিতি ব্রেকফাস্ট আর দাঁতভাঙা প্রাতরাশ লিখতে চাই, না হলে মনে হয় হজম হল না।

এই বিপদ থেকে উদ্ধারের আশা আমার অবশ্য রয়েছে। খবরের কাগজ সময়ের নিজস্ব নিয়মে মাধ্যম হিসেবে নড়বড় করছে সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে একা ছড়িঘোরানি লেখক পরিচিতির হদ্দমুদ্দ হয়ে যেতে পারে যে কোনো অখ্যাত ব্যক্তির একখান কমেন্টের আঘাতে একটা বিশাল জনতা পড়লেই বুঝে যেতে পারে তাবড় লেখক সাজা গলিয়াথ ব্যক্তি আসলে ওই অনামা ডেভিডের কমেন্টের গুলতিতে ধরাশায়ী। আও ভাঞ্জে বলে কোনো মিডিয়া-মামা সেই লেখককে বাঁচাতে পারবে না। এইটা বুঝে যাওয়ার পর থেকে একটা চোরা স্রোত, একটা চোরা টান আবার আসিছে ফিরিয়া এ পাগলা দাশুকে দরকার আছে। কারণ ওই নতুন বিন্যাস আর শব্দ বাছাই সাহিত্যের প্রাথমিক কাজ এবং তার জন্য গোঁয়ার নাছোড়বান্দা হতে হয় যে চলতি পথ মানব না, তৈরি করব নিজের ভাষা পৃথিবী দিয়ে নিজস্ব সাহিত্য পৃথিবী। একদম হালে গত একদশকে বেশ কিছু লেখকের লেখায় এটা দেখা যাচ্ছে, যাতে আমাদের খানিক আস্থা ফিরতেই পারে।


প্রকাশিত: ভাগাড় পত্রিকা