Friday, July 17, 2020

ফোঁড়া – ইলিয়াসের কথনের মধ্যে এক অপরের সন্ধান

কয়েকজন লেখক থাকেন যাদের সৃষ্টি শুধুমাত্র দারুণ সুন্দর বলার অপেক্ষা রাখে না; এমন কয়েকজনই থাকেন যাদের নিয়ে দায়-সারা নান্দনিক কথাবার্তা বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায় না বা আত্মশ্লাঘা নিয়ে বসে থাকা যায় না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এমনই এক লেখক। তাই তাঁর কাজ নিয়ে লেখাটা যুগপৎ স্বস্তির তেমনি আবার ভীষণ কঠিনও। স্বস্তির বললাম কারণ পেশাদার অ্যাকাডেমিক-সমালোচক আমি নই কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি লিখতে পারি  তাঁর লেখা যা আমায় ভাবায় যা তা আমি বলতে পারি নির্ভয়ে বুর্জোয়া অ্যাকাডেমিক তত্ত্বের বাইরে গিয়ে। কঠিন, কারণ তাঁর মতো মেধাবী ও শিল্পদক্ষ মানুষের কাজ নিয়ে আলোচনা করতে প্রয়োজন যে সব বিষয় তা আয়ত্তাধীন করাও সহজ কথা নয়।
এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক সামাজিক জীবন কতটুকুই বা জানি? আমাদের কাছে তাই সত্যিই ফোঁড়া ফুসকুড়ির মতোই মনে হয় অপর শ্রেণির মানুষের জীবন, আমরা যারা মধ্যবিত্ত যারা ভদ্রলোক তাদের কাছে। আমাদের শিল্প সাহিত্য সব কিছুই সেই দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখা। তার মাঝে ইলিয়াসের মতো লেখক আমাদের চমকে দেন। কারণ এই নয় যে ইলিয়াস কোনো নিম্নবর্গের দৃষ্টিকোণ তৈরির একটা ফাঁদ তৈরি করেছেন, না বরং তিনি ওই মধ্যবিত্তের দৃষ্টিকোণটাকে এমন অদ্ভুত ক্ষমতায় কথনে রেখেছেন যে পড়তে পড়তে পাঠক বুঝে যাবে তার ফাঁকগুলো, আর অপর শ্রেণির অবস্থান সম্পর্কে ধারণা করতে পারবে একটা। এটাই আমার ইলিয়াস পাঠ। বার বার ইলিয়াসে ফিরে যাওয়া যে কারণে।
এই যে একটা ছোট্ট গল্প ফোঁড়া তার পরিসরে কী দেখলাম মামুন নামে এক মধ্যবিত্ত রাজনীতি করা শিক্ষিত মানুষ তার দৃষ্টি কোণটা সামনে আনা হল, যদিও থার্ড পার্সন ন্যারেশন কিন্তু কথকে স্বর মামুনেরই, তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমরা দেখি রিকশাওলাকে। মামুনের বিরক্তি, ক্ষোভ, অবাক হওয়া, এবং ঔদাসীন্য থেকে বুঝতে পারি ইলিয়াস কীভাবে গড়ে তুলছেন দুটো চরিত্রকে মামুন ও রিকশাওলা। কড়া বামপন্থী বলবেন হ্যাঁ ইলিয়াস চাবকালেন মধ্যবিত্তকে, সে আত্মপ্রসাদ তাঁরা পেতেই পারেন, কিন্তু ওই সরলীকরণ যথেষ্ট নয়, আমরা কিন্তু দেখব কীভাবে একজন লেখক দুটি স্বরকে বুনে চলেছেন একটা ছোট গল্পের পরিসরে, পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের ভাষায় বলা যায় কন্ট্রাপন্টাল ভাবে। মামুনকে কোনোভাবেই বলা যাবে না নির্দয় বা অনুভূতিশুন্য মানুষ। সে নইমুদ্দিনের জন্য ঈদের দিন খাবার নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালে লোকটা স্ট্রাইক করতে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে সেখানে পড়ে রয়েছে মামুনের শুধু রাজনৈতিক দলীয় দায় নয় তার ভিতর দেখি একটা মমতাও রয়েছে। মামুন যখন রেগে যায় রিকশাওলার কথা শুনে যে বউকে মেরেছে তাতেও বুঝতে পারি সে অনুভূতিশীল। কিন্তু এগুলো তাকে এই রিকশাওলা বা নইমুদ্দীনের সঙ্গে এক জায়গায় আনতে পারে না, সেটা তার দোষ নয় সেটা শ্রেণিগত সমস্যা। এ অসাম্য মেটানো মামুনের নয়, হয়তো আমাদের হায়ার্কিকাল রাজনীতি দিয়ে নয় তা যতটাই বামমনস্ক হোক না কেন।
তাহলে কী ছিল গল্পটা? একটা জার্নি ছিল মামুনের, একটা মিথিকাল জার্নি মধ্যবিত্ত রাজনীতি সচেতন মানুষের হোলি গ্রেইল-এর খোঁজ, এবং সেই খোঁজ গল্পের শেষে ব্যর্থ হল, দীর্ঘ রিকশা-ভ্রমণের শেষে দেখা গেল মামুন কিছুই বুঝে উঠতে পারল না, এমনকি তার ওই খাবার নিয়ে যাওয়ার মহতী প্রচেষ্টা বা গ্র্যান্ড জেসচার যাই বলি না কেন একেবারে মাঠে মারা গেল। আধুনিক তত্ত্ব, বলে প্রত্যেক কথনে একটা জার্নি থাকে, নায়কের জার্নি দিয়ে শুরু, তার বোঝা/না-বোঝা, জয়/পরাজয় দিয়ে শেষ হয়। এই জার্নির শেষে আমরাও বুঝে উঠতে পারি আমাদের সাপেক্ষে চরিত্রগুলোর অবস্থান এবং কথকের অবস্থান। এখানেও নায়ক হিসেবে মামুনকে দেখি তার খোঁজ-এ বেড়িয়ে ব্যর্থ হতে। এই ব্যর্থতার মধ্যে একটা হালকা শ্লেষ রয়েছে, যার থেকে আমরা ক্রমশ রিকশাওলার দিকে আকৃষ্ট হই। ক্রমশ বোঝা যায় যে মামুনের মতো কথকের স্বরের ফাঁক দিয়ে দিয়ে ক্রমশ রিকশাওলার স্বর আমাদের সামনে একটা স্বতন্ত্র কথন তৈরি করছে। আমরা ঢুকে যাচ্ছি নইমুদ্দিন, রিকশাওলার জগতে। 
মামুনের দেওয়া একশ টাকা নিয়ে নইমুদ্দিন হওয়া হয়েছে হাসপাতাল থেকে, বাড়িতে ওই টাকায় ঈদের খাওয়াদাওয়া তা নিয়ে রিকশাওলা, যে নইমুদ্দিনের ফুফাতো ভাই, তার ঈর্ষা মামুনের কাছে কদর্য। অথচ সে নাচার কারণ এই শ্রেণির জন্য সে কাজ করছে এবং পার্টি তার কাজে খুশি হলেও সে নিজের দূরত্বটা কিছুটা ঠাওর করতে পারছে। কিন্তু তার রাজনৈতিক সচেতনতা বা সাংস্কৃতিক পরিশীলন যাই থাকুক না সে কিছুতেই তা বুঝে উঠতে পারছে না। 
কোথাও সরাসরি কিন্তু আমরা নইমুদ্দিন বা রিকশাওলার উপস্থিতি পাব না, আমরা বার বার দেখি কথকের বোঝার ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে। মামুনের শ্রেণিতেই আমরা পাঠকরা রয়েছি বলেই লেখকের কাছে এটা স্বাভাবিক উপায় মনে হয়েছে। তাই দেখি কথক একবারও রিকশাওলার নাম বললেন না, মামুনও তো নামটা জানতে চায়নি। মামুনের কাছে নইমুদ্দিন কিন্তু একটা পরিচিতিতে পৌঁছচ্ছে, তাকে যে দরকার ইউনিয়নের ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য। ফলে নইমুদ্দিন সাধারণ নিম্ন শ্রেণির মানুষ হলেও সে বাকিদের থেকে আলাদা সত্ত্বা হয়ে উঠছে মামুনের কাছে, সে ইউনিয়নের, সে সমষ্টিগত লড়াইয়ের হাতিয়ার ফলে তার ব্যক্তি পরিচয় তৈরি হয়। নইমুদ্দিনের উপর তার রাগ হলেও তার কিছু করার নেই, তাকে নিয়ে ভাবতে হবে, নেতৃত্বের একটা ভাগ নইমুদ্দিনেরও আছে। রিকশাওলা নিয়ে মামুনের সেসব ভাবনা নেই, ফলে সে নামহীন একটা মানুষ, এক রিকশাওলা মাত্র। আশ্চর্য ব্যাপার সেটা কি সেই রিকশাওলার মানসিকতাও নয়, সেও কিন্তু তার ফুফাতো ভাইকে আগের মতো দেখছে না, পার্টির দেওয়া টাকায় সেই সামান্য টাকাই ফারাক করে দিচ্ছে নইমুদ্দিন আর রিকশাওলাকে।
ব্যক্তির এই পরিচয়হীনতা গল্পের শেষে গিয়ে কোথাও একটা অস্বস্তি তৈরি করে আমাদের মনে। রিকশাওলা যখন পড়ে ধাকে আর মামুন প্রায় মাড়িয়ে দিয়ে চলে যায় তাকে, কোনো রাগ থেকে নয় নেহাত বুঝতে না পেরে, তখন এই পরিচয় ও পরিচয়হীনতার বিষয়টা আমাদের কাছে ফেটে পড়ে। শ্রেণি চরিত্র ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এই দুই-এর কোনোটা দিয়েই যেন ধরা যায় না এই অন্ধকারকে। আর তখনই বুঝতে পারি আমরা আসলে ভুলটা কোথায়। আমরা একটা ক্লিশে-র চোখ দিয়ে দেখি তাই মানুষগুলোর সঙ্গে মিলতে পারি না, ফাঁকটা থেকেই যায়। চিলেকোঠার সেপাই-এ যেমন হাড্ডি খিজির অলীক থেকে যায়, খায়বর গাজীদের দেখি কীভাবে মওকা বুঝে দেশপ্রেমী হয়ে ওঠে সেটা আমরা বুঝে উঠতে পারি না। একটা সহজ জাতীয়তাবাদ, একটা সহজ গণতন্ত্র ও বামপন্থী ধারণা যা আসলে ভিতরের গভীর বোধ থেকে উঠে আসেনি তা  স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই উপমহাদেশে ইলিয়াসের মতো লেখক কম, ইলিয়াস পড়তে পড়তে সাদাত হাসান মান্টোর কথা মনে পড়ে, বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। উপমহাদেশের আধুনিক সাহিত্যের আবির্ভাব খুব বেশিদিন নয় আর তা উচ্চমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তের পরিসরে রয়ে গেছে সেটা আশ্চর্যের না কারণ নিজের শ্রেণির সমস্যা বা ভাবনা থেকে সাহিত্যের বিকাশ হয়। সেই জায়গা থেকে আস্তে আস্তে ডিক্লাসড হওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। সেই চেষ্টার মধ্যে সে দেশের জল হাওয়ার খোঁজ থাকতে হবে, সে দেশের মানুষের হাঁড়ির খবর আর আঁতের খবর দুইই চাই। না হলে সেটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মান্টো, মানিক, বা ইলিয়াস সবাই সেই পথেরই পথিক। এঁদের লেখায় এই খোঁজটা যে কোনো পাঠকই বুঝে উঠতে পারবেন। এই ছোট্ট একটা গল্প ফোঁড়া একটা বড় পরিধিকে ধরে ফেলে যখন আমরা বুঝতে পারি কী লিখতে চেয়েছিলেন ইলিয়াস, তাঁর উপন্যাস বা গল্পের প্রাণ ভোমরা কোথায় ছিল লুকনো। 

প্রকাশিত: বাঘের বাচ্চা পত্রিকা

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ

No comments: