১৯২৭ সালে শহরতলির
জনৈক যুবক কলকাতার এক মার্চেন্ট অফিসের চাকরিতে ঢোকে। রোজ সে ট্রেনের
ফার্স্টক্লাসে চড়ে অফিসে যেত, পরনে ফিনলে মিলের ধুতি, শার্টের উপর
একতা গলাবন্ধ, পায়ে চামড়ার জুতো। জুতোটা ছিল কাস্টম মেড। অর্থাৎ সাহেবি দোকান থেকে
পায়ের মাপ দিয়ে কেনা। বাড়িতে ফিরে গিলে করা পাঞ্জাবি ও আরেকটি কাচা কাপড় পড়ে তাস
খেলতে যেত ক্লাবে। ভালবাসত ইংরেজি আসবাব, স্নো পাওডার এইসব শৌখিন জিনিস। কোনোদিন
স্বাধীনতা আন্দোলন, মিটিং মিছিল এসব করেনি, তবে গণতন্ত্রে বিশ্বাস ছিল, সেটাকে মনে
করত ইংরেজদের থেকে শেখা একটা ভাল অভ্যাস।
একই সময়ের আশেপাশে
আরেক যুবক মুর্শিদাবাদ থেকে আরেক যুবক আসে কলকাতায়। ভবানীপুরের মেসে ওঠে প্রথমে
তারপর সেখানে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। সেও সচ্ছল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের
সন্তান। সেই যুবক ছিল জাতীয়তাবাদী। তার পোশাক তাই খদ্দরের মোটা কাপড়, খদ্দরের
পাঞ্জাবী। অভিনয় করতে ভালবাসত, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ছিল মুখস্থ। বাড়িতে ছিল
স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিবেশ, তার দিদি মুর্শিদাবাদ জেলা থকে প্রথম মহিলা কংগ্রেস
সদস্যদের একজন, জেল খেটেছেন, চরকা কাটতেন তার জাঠতুতো দাদা বাংলা কংগ্রেসের বড়
মাপের নেতা।
প্রথম জন আমার
পিতামহ, দ্বিতীয়জন আমার মাতামহ। দেখাই যাচ্ছে দু’জনের
জীবনযাপন, ভাবনা ইত্যাদির মধ্যে কোনো মিল ছিল না একেবারেই দুই মেরুর বাসিন্দা যেন। একমাত্র মিল যেটা, সেটা হল এরা এমন
সময়ের বাঙালি যাদের মধ্যে প্রভূত অমিল থাকলেও, এরা ছিলেন আনখশির বাঙালি। এবং আরো
চোখে পড়ার মত ব্যাপার হল এরা দুজনেই নাগরিক, দারুণ রকমের নাগরিক তাদের মানসে, ও
যাপনে। এটা কবি বুদ্ধদেব বসুর সময়। বুদ্ধদেব বসু এই সময়ের সৃষ্টি।
সময়ের সৃষ্টি বলে তাকে কোনোভাবে খাটো করা হচ্ছে এমন নয়। নিজের
সময়ের সঙ্গে কীভাবে আদানপ্রদান করে একজন তীক্ষ্ণ, মননশীল এবং সৃজনশীল মানুষ নিজেকে
গড়ছেন, এবং তার সঙ্গে প্রভাব ফেলছেন আশপাশে – সেটা জানা
ভীষণই গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক মননের উন্মেষে, সে সময়ের সংস্কৃতির পরিচয় জানতে
বুদ্ধদেব বসুর এই পরিচয় জানা জরুরি।
প্রায় একশ বছর
পেরিয়ে যেতে চলেছে, ফিরে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায় বিংশ শতকের শুরুতে একটা কসমোপলিটান
শহর হয়ে উঠছিল কলকাতা, একটা আধুনিক নাগরিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। একে বাংলার নবজাগরণের শেষ জোয়ার হিসেবে দেখা যেতে পারে। উনিশ
শতকে বাংলার নবজাগরণ বলতে আমরা সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তন বুঝি –
রামমোহন, বিদ্যাসাগর বা ইয়ং বেঙ্গলদের কাছে সামন্ততান্ত্রিক ধারণার বিরুদ্ধে
আন্দোলন যতটা মুখ্য ছিল নতুন সাহিত্য বা শিল্প সৃষ্ট ততটা নয়। যদিও সেই কাজের প্রভাবে নতুন সাহিত্য তৈরি
হয়েছে।
পরের শতকে বিশেষ
করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বুর্জোয়া
ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে বাংলায়, সেই ব্যবস্থার থেকে পুষ্টি আহরণ করে ফুলে ফেঁপে
ওঠে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। আবার তার সুদূরপ্রসারী ভয়ংকর স্বার্থপর চেহারার অনুধাবন করে বিহ্বল হয়ে দাঁড়ানো শুরু হচ্ছে। এই
দ্বন্দ্বের জায়গাটা থেকেই বাংলায় আধুনিক সাহিত্যের শুরু। শুধু বাংলায় কেন, এই পরিস্থিতি
ছাড়া কোথাওই আমরা আধুনিকতা বা মডার্নিজম বলি যাকে, তা তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। এই
অবস্থাটা আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টির পূর্বশর্ত বলা যায়।
প্রশ্ন উঠবে রবীন্দ্র
সাহিত্য কী আধুনিক বাংলা সাহিত্য নয়? উত্তরটা গোলমেলে। কারণ রবীন্দ্রনাথের মধ্যে
যথেষ্টই আধুনিকতার চিহ্ন রয়েছে, নাগরিক সৃষ্টি তো বটেই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখতে
গেলে তিনি আধুনিকতার অগ্রদূত, কিন্তু সন্তান নন। সে সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য
বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্তদেরই হয়েছিল। তার একটা বড় কারণ, উনিশ শতকের
শেষভাগে শিক্ষার প্রসার ও গনতান্ত্রিকীকরণ। শুধু জমিদারের ছেলে হিন্দু কালেজ আর
সংস্কৃত কালেজে পড়বে তা রইল না। শিক্ষা সাধারণের নাগালে এল।
হতে পারে তা
ইংরেজের কেরানি তৈরির ফন্দি, কিন্তু শুধু এইটুকু বললে বাংলার সংস্কৃতিতে একটা বিরাট অবদানকে খামোখাই অস্বীকার করা হয়।
শুধু কেরানি তৈরির জন্য হলে, সে শিক্ষা এত ভয়ংকর-ভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা একটা শক্তিশালী
সংস্কৃতি তৈরি করে কী করে? আর এটাও মনে রাখার এই শিক্ষা প্রসারে বিদ্যাসাগর থেকে
আরো অনেকেরই সারা জীবনের চেষ্টা রয়েছে, যারা শুধু কেরানি তৈরি জন্য কাজ করেছেন
ভাবাটা অসম্ভব। আছে ব্রাহ্মদের অবদানও। ব্রাহ্ম ধর্ম আন্দোলন হিসেবে ব্যর্থ হোক আর যাই হোক, সামাজিক ও
শিক্ষার প্রসারে ব্রাহ্মদের অবদান অনস্বীকার্য।
বরিশাল থেকে
বর্ধমান, সর্বত্র সামাজিক জীবনে একটা পরিবর্তন তৈরি করে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসার। নীরদচন্দ্র চৌধুরি লিখেছেন
তাঁর ছোটবেলায় বনগ্রামে তাঁরা টম ব্রাউন অভিনয় করতেন, খোঁজ রাখতেন দেশ বিদেশর। এবং
তাদের অভিনয় গোটা গ্রামের শিক্ষিত শ্রেণী দেখতে আসত। তাঁর মত, ‘কলিকাতায়
যে নূতন বাঙালী মনের সৃষ্টি হয়, তাহার অন্তর্নিহিত শক্তিতে বাঙালীর গ্রাম্য মনের
মূর্তিও অন্যরূপ ধারণ করেছিল।’১
এটা বোঝা যায় যখন
দেখি বুদ্ধদেব, অজিত দত্ত, জীবনানন্দ কলকাতার বাইরে বড় হয়েছেন, অন্য শহরে, এবং
মজার ব্যাপার এরাই নাগরিক বাংলা সংস্কৃতির এবং আধুনিকতার প্রতিনিধি। বুদ্ধদেব ঢাকা
থাকাকালীনই কবিতা লিখেছে, বন্দির বন্দনা সেখান থেকেই হইচই ফেলে দিয়েছিল গোটা
বাংলায়। তবে সেই কবিতাগুলো ছিল রোম্যান্টিক কবিদের অনুসরণে, অর্থাৎ শেলি, বাইরন-এর
প্রভাব খুবই স্পষ্ট, ‘প্রবৃত্তির
কারাগারে বন্দি করে রেখেছ-র’ মত
বিখ্যাত পঙক্তি ইংরেজ রোম্যান্টিকদের ব্যক্তিবাদের উচ্চারণ হিসেবেই দেখতে হবে,
আধুনিক নাগরিকতা-বিদ্ধ কোনো স্রষ্টার নয়। রোম্যান্টিকতা
তাঁর ছিল ঐতিহ্যলব্ধ সংস্কৃতি। বন্দীর বন্দনায় যে শেলিয়ান বিক্ষোভ দেখি তা ঈশ্বরের
বিরুদ্ধে। এখানে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে
ব্যবহার করা হচ্ছে রবীন্দ্রকাব্যের মঙ্গলময় বিশ্ব বিধাতার ধারণার বিপরীত হিসেব। বিশের দশকের মাঝামাঝি
সময় নাগাদ ঢাকা থেকে তিনি প্রগতি পত্রিকা বের করতে শুরুর করেছিলেন। আন্দোলনের শুরু ওখানেই, বন্দির বন্দনা বেরিয়ে গেছে, বেরিয়েছে আরো কবিতার
বই। ১৯৩১ নাগাদ পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় আসার পরই তাঁর কবিতা বদলে গেল।
তিরিশের দশক থেকে
তাঁর কবিতায় দেখা গেল অন্য ছবি। ‘আমন্ত্রণ
রমাকে’, ‘কোনো
মেয়ের প্রতি’ ইত্যাদি কবিতায়
দেখা যাচ্ছে নাগরিক জীবন ঘিরে প্রতিটা ছবি, এর আগে রবীন্দ্রনাথের যে গ্রাম বাংলার
প্রকৃতির ছবি কবিতার মূল বিষয় ছিল তা উবে গেল এক নিমেষে। রোম্যান্টিক ভাবনার থেকে সরে
বুদ্ধদেব দাঁড়ালেন একদম নাগরিক
প্রেক্ষাপটে সমসময়ের মুখোমুখি। কারণ রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে নতুন স্বরটা বড় কথা নয়,
১৯২৯ রবীন্দ্রনাথ লিখে ফেলেছেন শেষের কবিতা, তিনিও বদলে নিয়েছেন নিজেকে প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের পর। ছন্দের ক্ষেত্রে ভাষা ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথ অনেক বহুমুখী
বুদ্ধদেবের থেকে। যেটা লক্ষণীয়, সেটা হল নতুন দৃশ্যকল্পের প্রয়োগ, বুদ্ধদেব
একেবারে শহুরে, নাগরিক ইমেজারি ব্যবহার করতে শুরু করলেন। এবং কবিতাকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন ভাবনার
সরাসরি প্রয়োগের দিকে।
এটা বুদ্ধদেবের
পূর্ববর্তীদের মধ্যে দেখা যায়নি। নাগরিক কবিতা বুদ্ধদেবদেরই সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথের
গ্রাম নয় বরং ‘পৌষ পূর্ণিমায়’ দেখছি
আমরা কলকাতার দম-চাপা নাগরিক জীবন যেখানে ‘চাঁদের
বন্দনা করে শুধু কাক – শুধু কাক – কাক।’ শালিখ, চড়ুই,
কাকের ডাক ফিরে আসে ‘মৃত্যুর পরে:
জন্মের আগে কবিতায়’ কারণ এই যে শীতের
বর্ণনা এই যে যৌবনের উল্লাস অথবা বার্ধক্যের তেতো স্বাদ এ শহর ঘিরে বেড়ে ওঠা ও
বেঁচে থাকা এক ব্যক্তি মানসের অভিজ্ঞতা। বর্ষার দিনে যে লোকটা শ্রাবণের আলিঙ্গন চায়, সে আসলে নগর জীবনে ক্লান্ত, তার কোনো পরিচিতি
সে খুঁজে পাচ্ছে না, “আমি সেই ভিড়ে নিঃশেষে
মিশে গিয়ে/ চলি একাগ্র নিরুপাধি, নামহীন’। একেবারে মধ্যবিত্ত নাগরিক মানুষের দৈনন্দিনতা, তার ভাল লাগা
মন্দ লাগাগুলো উঠে আসছে কবিতায়। যে মানুষ সংবেদনশীল অথচ ভিড়ের মাঝখানে একা এই
মানুষের সত্ত্বা হাঁপিয়ে উঠছে। এই সুর বাংলা কবিতায় আগে কখনও বাজেনি। লক্ষ্য করার
মত ব্যাপার এই সুর স্তিমিত, বিষণ্ণ কখনও তার মধ্যেও আশা রয়েছে, আনন্দ রয়েছে। যেটা
নেই সেটা হল কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শগত চিৎকার। বুদ্ধদেব সন্তর্পণে একে এড়িয়ে
গেছেন।
এই যে নাগরিক
পক্ষাঘাত কবিতার বিষয় হয়ে উঠছে, এটা শুধু ইউরোপীয় আধুনিক কবিতার নকলনবিশী নয়,
বোদলেয়রের থেকে অন্ধ ধার করাও নয়। বোদলেয়ারের কবিতা তাকে প্রভাবিত করেছে ঠিকই, কিন্তু বুদ্ধদেবের কবিতার স্বরটা পুরো আলাদা। এই
পার্থক্য থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। হতে পারে বোদলেয়ারের মত তাঁরও প্রথম নগর জীবনের
সঙ্গে সংঘাত মননে যে অভিঘাত তৈরি করেছে তা নতুন, হতে পারে তাঁর বোদলেয়ার প্রীতি রয়েছে,
তাহলেও কবিতার ভাবনায় তিনি সম্পূর্ণ আলাদা। খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায় বুদ্ধদেব
বোদলেয়ারের অনুবাদ করছেন বেশ বেছে বেছে। নিজস্ব একটা মূল্যায়ন তৈরি করছেন
নাগরিকতার, যেটা নাগরিক সাহিত্য হয়েও বিশিষ্টভাবে বাঙালি। বোদলেয়ারদের বোহেমিয়ানি
একটা প্রতিবাদ, সামাজিক অবস্থা ও ধ্রুপদী কবিতার ধারার বিরুদ্ধে। ফলে সেখানে নানা ঘাতপ্রতিঘাত আসছে কবিতায়, অন্ধকার
দিকগুলো নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে উঠছেন তাঁরা, তার উদযাপনও করছেন। বুদ্ধদেবের নাগরিকতা পরিশীলনের কথা বলছে, সেটা
ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করছে, একটা সুস্থ জীবনের উদ্দেশ্যে। সমাজ সম্পর্কে
তিনি সম্পূর্ণ বীতস্পৃহ হয়ে উঠছেন না বরং ভিড় জটলা তাঁর কাছে অশিক্ষিতের চিৎকার,
আর তাই ব্রাত্য।
‘রাত
তিনটের সনেট’-এ দেখি এই ভাবনা
স্পষ্ট। যীশু কি পরোপকারী/ ছিলেন, তোমরা ভাবো? নাকি বুদ্ধ কোনো সমিতির/ মাননীয়
বাচাল, পরিশ্রমী, অশীতির/ মোহগ্রস্ত সভাপতি?..’ এই
নাগরিকতার চিৎকারের বর্ণনা শেষ হচ্ছে কোনো প্রতিবাদে নয় বরং ব্যক্তিগত বোঝাপড়ায়, ‘ যে-সব
খবর নিয়ে সেবকেরা উৎসাহে অধীর,/ আধ ঘণ্টা নারীর আলস্যে তার ঢের বেশি পাবে।’ এখানেই
বোদলেয়রের থেকে বদলে গেল স্বর, সোচ্চার বিদ্রোহের বদলে এল নিজেকে সঁপে দেওয়া
ব্যক্তিগত আলস্যে, সম্পর্কে।
উনবিংশ শতকের বুর্জোয়া
নাগরিক জীবন, বোদলেয়র ও তার সময়ের সংবেদনশীল মানুষদের হতবাক করে দিয়েছিল। কী করে
একটা ব্যবস্থা ব্যক্তির সব পরিচয় গিলে ফেলে তাকে ইতিহাস বর্জিত এক অস্তিত্বহীন
যন্ত্রে পরিণত করে তা তাদের স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আবার তার বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়তদের লড়াইটাও ছিল সেই সমাজের
অঙ্গ। এবং সে লড়াই একেবারেই স্পষ্ট এবং ঘটমান বোদলেয়ারের সামনে। ব্যক্তিবাদ ছিল
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এই আগ্রাসী চেহারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এই লড়াইটা কিন্তু
বুদ্ধদেবদের নয়। একমাত্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছাড়া শ্রেণী দ্বন্দ্ব একেবারেই প্রকট
ছিল না তার সময়ের বাংলায়। বরং তাঁর সমাজ
গড়ে উঠেছে বুর্জোয়া ব্যবস্থার সুফল হিসেবে। নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজ পুষ্ট হচ্ছে
তাতে। এবং গত শতাব্দীর যে সংস্কার আন্দোলন তার আদর্শ মুছে যায়নি তখনও। ফলে তিনি
নাগরিক পক্ষাঘাতকে দেখছেন একটা রোগ হিসেবে। যে রোগের দাওয়াই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের
বিকাশ, অন্তত বুদ্ধদেবের কাছে।
২
বাস্তবের শহর আর
শিল্পীর কল্পনার শহর এ দু’টোর
পার্থক্য রয়েছে। এই দুই মিলিয়েই আমাদের একটি শহরের ধারণা তৈরি হয়। ধরুন প্যারিস শহর বললে
যে ছবিটা মাথায় ভেসে ওঠে, তার মধ্যে বাস্তবের প্যারিস যেমন রয়েছে তেমন রয়েছে বহু
শিল্পী সাহিত্যিকদের কল্পনার মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া একটা ছবি। বোদলেয়ারের কোনো
কবিতা থেকে উঠে আসা রাস্তার বর্ণনা বা জোলার উপন্যাস, বা কখনো ত্যুলু লোত্রে ছবিতে
মুল্যা রুজ, রেনোয়া-র বৃষ্টি ভেজা বাজার, এমন সব নানা কবিতা, ছবি, গল্প মিলিয়ে
প্যারিস শহর তৈরি হয়ে চলেছে আমাদের মাথায়। এই ছবিটাও পরিবর্তনশীল কারণ বহু সার্থক
শিল্পী নতুন নতুন দিক তুলে ধরছেন আর আরেকটা নতুন দেখা তৈরি হচ্ছে। এই দৃশ্যগুলো
শুধু ছবি নয় নানা ভাবও তৈরি করে মনের ভিতর।
লোত্রের মুল্যা রুজ-এ ক্যানক্যান নর্তকীদের পায়ের কথা ভাবুন যা তারা একসঙ্গে ছুঁড়ে
দিয়েছে সামনের দিকে, এই একটা ছবি কী শুধু মুল্যা রুজ-এর প্রতিবিম্ব না তার সঙ্গে
জড়িয়ে থাকা আরো অনেক ধারণা, ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে? মনে পড়িয়ে দেয় না কী এই ছবি, উনবিংশ শতকের শেষভাগের
প্যারিস তার আন্দোলন তার বিদ্রোহ আর তার নতুন মননের কথা?
একই ভাবে যখন আমরা
বুদ্ধদেব বসুর সৃষ্টিকে দেখি তাঁর, কবিতাই হোক বা গল্প বা প্রবন্ধ, সেটা বাঙালির
নগর যাপনের ভাবনাকে এবং তার মননকে চিহ্নিত করে। তাঁর কোনো একটি কবিতা, বা দারুণ
কোনো পঙক্তি যেগুলো মুখে মুখে ঘোরে, সেগুলো নয় বরং সামগ্রিকভাবে তাঁর সৃষ্টি বাংলা
কবিতাকে নিঃশব্দে বদলে দিয়েছে। চট করে এটা বোঝা যায় না, কিন্তু বুদ্ধদেব পরবর্তী বাংলা কবিতার
আধুনিক যে উচ্চারণ তা কোনো না কোনো ভাবে বুদ্ধদেবের কবিতা ভাবনার প্রভাবে তৈরি।
অর্থাৎ যদি কোনো রাজনৈতিক আদর্শ মুক্ত, এবং অতীন্দ্রিয় চেতনার বাইরে দাঁড়ানো ব্যক্তি-সচেতন
মনের প্রকাশ হয় কবিতা তাহলে বুদ্ধদেবকে
আপনার পথিকৃৎ স্বীকার করতেই হবে।
বুদ্ধদেব এ ব্যাপারে
প্রথম থেকেই সচেতন ছিলেন। নিজেও স্বীকার করেছেন যে তাঁর প্রগতি পত্রিকা ছিল কল্লোল
পত্রিকার এক্সটেনশন। অর্থাৎ আধুনিক সাহিত্য তার উদ্দেশ্য। এর প্রধান অন্তরায় তাঁর
ঢাকা থাকাকালীন ছিল তিনি ভিক্টোরীয় সাহিত্যের বাইরে খুব বেশি অন্য আধুনিক ইউরোপের
হল হদিস পাচ্ছিলেন না। কলকাতা তাকে সেই সুযোগ দিয়েছিল। তাঁর নিজের লেখা প্রবন্ধ
পড়লে বোঝা যায়, এই যে নাগরিক সাহিত্যিক, নাগরিক সাহিত্যিক বলে তাঁকে বারবার অভিহিত
করছি, সেই নাগরিকতা ব্যাপারটা তিনি কীভাবে আয়ত্ত করেছেন।
প্রথমত তিনি যে
বিশাল ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন তা নয়, মোটামুটি তাঁর পিতামহের সঞ্চয় আর বৃত্তির উপর নির্ভর করে চলতে হত তাকে,
তারপর শিক্ষকতা এবং পেশাদার লেখক হিসেবে রোজগার করে। এই মধ্যবিত্ত পরিবেশেও তিনি একটা জীবন যাপন চালিয়ে গেছেন যা
হিংসের যোগ্য। ভাবুন এই লোকটি তাঁর একটা ধরাবাঁধা আয়ের মধ্যে থেকেও কী করছেন। তার
জীবন যাপন বোহেমিয়ান নয় বরং সংসার রয়েছে স্ত্রী কন্যা সমেত। অথচ কবিতা-র মতো একটি
পত্রিকা প্রকাশ করে চলেছেন টানা, বই প্রকাশ করছে, আধুনিক সাহিত্যের নতুন ধারার
সঙ্গে সঙ্গে চলছে। সুধীন্দ্রনাথ ও তার পরিচয় গোষ্ঠী হোক বা পরবর্তীকালের সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের কৃত্তিবাস গোষ্ঠী বুদ্ধদেবের উৎসাহ ঘিরে রয়েছে
সবকটাতে। যদিও এটা ঠিক পরিচয় গোষ্ঠী আর তার আড্ডা সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক ধারণা হয়েছিল
যে সেখানে বড়ই তাত্ত্বিকদের ভিড়। এই ধারণা সুধীন্দ্রনাথ দত্তর সঙ্গে মত বিনিময়ে কোনো ব্যাঘাত ঘটায়নি।
দীর্ঘ তিন চার দশক ধরে তাঁকে ঘিরে সাহিত্যিক ও
বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ড, এর কারণ তিনি নিজেকে শুধু কবি হিসেবে দেখেননি বরং আধুনিক
সাহিত্যিক হিসেবে দায়টা নিয়েছেন বিশ্লেষণ করার নিজেদের কাজের। তিনি একজন সম্পূর্ণ সাহিত্যিক
এবং তাঁর কাজের কথা ভাবলে এটা ভোলার কোনো জায়গা নেই।
সেই সময়ে দাঁড়িয়ে
এই ব্যক্তিগত জীবন চর্যা যা রুচি আর শিক্ষার সঙ্গে মিশে তৈরি এটাও খুব কম বড় কথা
নয়। এই জীবন যাপন বুঝতে গেলে তাঁর প্রবন্ধ, জীবনী ইত্যাদি গদ্যগুলো বারবার পড়া
দরকার। সেখান থেকে সুলুক সন্ধান মিলতে পারে লেখক বুদ্ধদেবের মননের।
কেতকী কুশারি ডাইসন
লিখছেন বুদ্ধদেব সম্পর্কে, What
began so auspiciously matured in his later years into a deep wisdom which
rejected narrow, tribal-style nationalism in favour of international humanism –
ideas in a direct line of descent from Tagore, but
backed up by his own experience... political thinking, as evident in his
writings and published correspondence, was strikingly mature. In his faith in
non-violence, democracy, secularism, and pluralism, he was a true child of his
times, and his deep distrust of violence, dictatorship, and Stalinist-style
autocracy was far-seeing, though his refusal to align himself with the
political left did have some consequences for his image and publicity when the
left came to dominate political life in West Bengal. ২
এই ব্যাপারটা তলিয়ে
দেখার রয়েছে। বুদ্ধদেব তিরিশের দশকের বাঙালি যিনি কোনো রকম বামপন্থী আদর্শে
উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন না। বরং রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি হিসেবে সাহিত্য ও শিল্পকে
দেখছেন। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা আর বামপন্থী রাজনীতি হাত ধরাধরি করে এসেছে এটা
যেমন ঠিক কিন্তু সেটা একমাত্র ঘটনা নয়। সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মাণিক
বন্দ্যোপাধ্যায়রা যেমন ছিলেন তেমন জীবনানন্দ, বুদ্ধদেবরাও একই রকম ভাবে নিজেদের
সময়কে দেখেছেন। ব্যাপক শিল্পায়ন দারিদ্র্য বৃদ্ধি, মন্দা, বিশ্বযুদ্ধ ইত্যাদির
মুখোমুখি হচ্ছেন তারাও এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি একজন ব্যক্তিগত মানুষের একজন একক
শিল্পীর দৃষ্টি।
সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ এই পথে হাঁটা শুরু করে
দিয়েছিলেন আগেই, শেষের কবিতা, চার অধ্যায়,
ল্যাবরেটরি, রবিবার, মালঞ্চ, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যাচাই করা। গল্পের নিটোল চেহারা থেকে সরে মানুষের অন্তরের কথা সামনে
নিয়ে আসছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রশ্ন তুলছেন, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য, সম্পর্ক নিয়ে।
বুদ্ধদেবের লেখায় এটা আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। নান্দনিকতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের
অনুসারী এবং আপসহীন। ব্যক্তি মানুষের ও শিল্পীর জীবনে যে রাপচার ঘটছে, জীবন ও
নান্দনিক অনুভূতির মধ্যে একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, এটা বারবার তার লেখায়
ফুটে উঠছে, ব্যক্তি এখানে কোনোভাবেই রাজনীতি বা সমাজ বা সাধারণ্যের অংশ হিসেবে তার
সুকুমার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে না, এই বিশ্বাসে পৌঁছচ্ছেন বুদ্ধদেব। এটাই তাকে
রবীন্দ্রনাথের থেকে দূরে নিবে যাচ্ছে, যেখানে কোনো এক মহাজাগতিক অটল বিশ্বাস এসে
তাঁকে মুক্তি দিচ্ছে না। বরং ব্যক্তিগত গ্লানির মধ্যেই মানুষকে খুঁজে পাচ্ছেন। এটা
তিরিশের আধুনিকতার মূল সুর। এই সুর শুধু বুদ্ধদেব নয় সুধীন দত্ত, জীবনানন্দের
মধ্যেও প্রচ্ছন্ন রয়েছে।
কোনোভাবেই তিনি
গণ্ডির মধ্যে আটকে যাচ্ছেন না, সেটা সাহিত্যের বা রাজনীতির কোনো আদর্শের গণ্ডি হতে
পারে। বুদ্ধদেব বসু কোনো সাহিত্য আন্দোলনের পথিকৃৎ নন, ব্যক্তিজীবনে তাঁকে আমরা
দেখি কী ভীষণ সামাজিক, নানা কর্মকাণ্ড জড়িত, পড়াচ্ছেন বিশ্ব বিদ্যালয়ে, ঝাঁপিয়ে
পড়ছেন তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ তৈরিতে দেশে বিদেশে সেমিনারে যোগ দিচ্ছেন অথচ
সাহিত্যিক হিসেবে নিঃসঙ্গ। ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণ আময়িক, আমুদে, আড্ডাবাজ এক লোক
তাঁর বাড়ি কবিতা ভবন আড্ডার পীঠস্থান বলা যায়। তাঁর মেয়ের বর্ণনায় আমরা পাই, Here, numerous visitors known and unknown dropped in without any
prior appointment, children’s friends freely came and went at all times,
servants behaved like bosses without any dress code (read bare-bodied with
knee-high dhoties), and an unmanageable number of books competed with the residents
for space in a two-and-a-half roomed flat, that was called “Kavita Bhavan”. 202
Rashbehari Avenue, the postal address of which house later became quite famous
simply as “202” among the intellectuals of Kolkata. ৩
আড্ডা সম্পর্কে
তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি একটি নাগরিক পরিশীলনের, যেখানে বৌদ্ধিক এবং রসিক মনের পরিচয় আমরা
পাই। এটা কোনো গোষ্ঠিতান্ত্রিকতার চক্র নয় বা সাহিত্যচর্চার কোনো রক্ষণশীল দাঁত
কামড়ানো চণ্ডী মণ্ডপ। বরং এর মধ্যে উদার, খোলামেলা মনের আদান প্রদান রয়েছে যা
অবকাশকে সুযোগ দেয়, হাঁপ ছাড়ার সুযোগ দেয় মনকে।
এই আড্ডা কিন্তু
কোনো রকম অতিরেককে প্রশ্রয় দেয় না। অতিরেক জিনিসটা বুদ্ধদেবের না পসন্দ, ওর মধ্যে
যে চড়া ব্যাপারটা রয়েছে তা তাঁকে ক্লাম্ত করে।
আর্ট ফর আর্ট সেক
বা শিল্পের জন্য শিল্প এই ভাবনার সাহিত্যিক হিসেবে বুদ্ধদেব-এর পরিচয়কে ঠেলে দেওয়া
যায় না। এখন দাঁড়িয়ে বুদ্ধদেবের পুনর্মূল্যায়ণ প্রয়োজন। অতিরেকের বিরুদ্ধে থাকা এক
ব্যক্তিসচেতন মানুষকে চিনতে হবে। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি গিনসবার্গ বা বিট জেনারেশন
নিয়ে তাঁর ধারণা যদি দেখি আমরা। গ্রিনিচ ভিলেজে যাচ্ছেন যখন গিনসবার্গ আমেরিকায়
আভা গার্দ কবি বলে সমাদৃত। গিনসবার্গকে দেখছেন ও তাঁর লেখা পড়ে বলছেন গিনসবার্গ-এর
উচ্ছ্বাস সরিয়ে দিলে আদপে একজন শিক্ষিত এবং শক্তিশালী কবি। বিট জেনারেশনকে তিনি
দেখছেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যেখানে তাঁর চোখে পড়ছে অনেক ফাঁপানো ব্যাপার রয়েছে,
বাজারিকরণ রয়েছে, তবু তিনি তাদের মধ্যে যেটুকু শিল্পের প্রতি ভালবাসা রয়েছে
সেটুকুকে তো অস্বীকার করছেন না। এ নিয়ে ফাল্গুনী রায় তাঁর কবিতায় বুদ্ধদেবকে তির্যক
মন্তব্য করেছেন, কিন্তু এ মন্তব্য যতটা আবেগ বা অভিমান থেকে ততটা যুক্তির দিক থেকে
প্রযোজ্য নয়।
আসলে পরিশীলন
বুদ্ধদেবের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, এটা বুঝতে হবে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে যিনি পারছেন
না ভিড়ের তাণ্ডব সহ্য করতে, চলে আসছেন ওয়াইএমসিএ-তে খাচ্ছেন শেরি শুধু নিজেকে
আলাদা রাখতে, সংহত রাখতে। এটাই বুদ্ধদেব, এটাই তিরিশের দশকের আধুনিকতা। সময়ের
সঙ্গে সঙ্গে যখন স্থূল উচ্ছ্বাসগুলো কেটে যাবে, ফেনা শুকিয়ে যায় তখন স্পষ্ট হয়ে
ওঠে শিল্পের অনেক দিক যেগুলো হয়তো ঢাকা পড়েছিল। বুদ্ধদেবের লেখায় এই অনুচ্চার,
মৃদুভাষ লক্ষণগুলো আদর্শগত উচ্ছ্বাসে অনেকটাই ঢাকা পড়েছিল। এখন এই একুশ শতকে এসে
যখন একেকটা আদর্শ সে রাজনৈতিকই হোক বা অর্থনৈতিক বা সামাজিক ভেঙে পড়েছে, তখন দেখা
যাচ্ছে শিল্পের ক্ষেত্রে কোথাও একটা বুদ্ধদেব বা তার সমসাময়িক অনেককেই আমরা ভুল
বুঝেছি। রোম্যান্টিক কবি বা উপন্যাসিক বুদ্ধদেবের থেকেও যে তাঁর মননশীল লেখক-সত্ত্বাটি
অনেক জরুরি তা এখন বোঝা যাচ্ছে।
আধুনিকতা বা নাগরিক
জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে কোন শিল্পী কীভাবে তাঁর মুখোমুখি হবেন বা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি
কী হবে সেটা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক একটা স্টিরিওটাইপ তৈরি করা বোকামি। সেটা আদর্শ হতে
পারে বা আমদানি করা তত্ত্বের হুবহু অনুকরণ দু’টোর
ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বুদ্ধদেব বসুদের দৃষ্টিকোণ একই সঙ্গে লালিত বাংলার পরম্পরায়
আবার তার সঙ্গে মিশছে পাশ্চাত্য র্যাডিক্যাল সব ভাবনা। এর সমন্বয় করতে গিয়ে অনেকেই
তাঁদের ঐকিকতা রক্ষা করতে পারেননি। বুদ্ধদেব বসু সফল আর তাই হয়তো দলছুটও। কেতকি ডাইসনের এ বিষয়ে বক্তব্য ভেবে দেখার মত, Strangely, I have noticed that some people seem to
locate the arrival of modernism in Indian writing in the fifties or sixties,
but that is because they are not looking beyond English-language writing for
its signs. In the pan-Indian perspective, the native Indian languages must
surely be included in the map. The adjective ‘Indian’ makes no sense otherwise.
From the point of view of Bengali writing...... The magazine Pragati, run by Bose as an undergraduate in Dhaka
between 1927 and 1929, with the help of his friend Ajit
Datta, made a remarkable contribution to the
modernist movement which was brewing in Bengal in the twenties. ৪
এইখানে দলছুট হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ঘটছে দু’ভাবে প্রথমত ভারতীয়
সাহিত্যের ক্ষেত্রে আধুনিকতার বিষয়টা ধরা হচ্ছে ইংরেজি লেখার থেকে। আবার, দেশীয়
সাহিত্যের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আদর্শগত অবস্থান নির্বাচন করছে আধুনিকতার সংজ্ঞা। এই
দুইয়ের মাঝখানে বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্ত, জীবনানন্দের আধুনিকতা চাপা পড়ে গেছে। এরা
প্রত্যেকেই দুই ভাষায় পারদর্শী ছিলেন, এবং লিখেওছেন অল্প বিস্তর ইংরেজিতে কিন্তু
সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাষাকে তারা ছেড়ে দেননি। এবং এটা শুধু ভাষার
ক্ষেত্রে নয় ভাবনার ক্ষেত্রেও একেবারে সম্পূর্ণ বিদেশী কোনো দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্রয়
দেননি। একটা নিজস্ব ঐকিক সংস্কৃতি তৈরির জন্য সারা জীবন কাজ
করে গেছেন। এই কাজটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এর ফল
হিসেবে আমরা অন্তত এখনো ভাবতে পারি শিল্প বা সাহিত্যের ক্ষেত্রে ঐকিকতা রক্ষা করার
কথা।
সাহিত্যিক হিসেবে এই সচেতনতা ভীষণ দরকার। শুধু নিজের মাতৃভাষায় লিখলেই তা
তো নিজস্ব ধন হয়ে ওঠে না। মনে রাখতে হবে এই বাংলা ছিল ইউরোপীয় উপনিবেশের গবেষণাগার, মেকলের
আমল থেকে যে ব্রাউন সাহেব তৈরির চেষ্টাগুলো হয়েছে তার সব কিছুর এপিসেন্টার এই
কলকাতা। ফলে আমরা সেই ইতিহাস এড়াতে পারি না। আমাদের সংস্কৃতিতে ইউরোপীয় যা কিছু
ধারণা তার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে গণতন্ত্র থেকে সাম্যবাদ, বা উত্তর
আধুনিকতা সব রকমের ধারণাগুলোই কোনো না কোনো ভাবে আমাদের সংস্কৃতিতে ছাপ রেখা গেছে।
এর বিপদ হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই নিজস্বতা হারিয়ে যেতে পারত। আমাদের সৌভাগ্য এর মধ্যে
দাঁড়িয়ে শুধু ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্যকে পুঁজি করে আমরা নতুন কিছু তৈরির চেষ্টা করিনি,
রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ এক নতুন দিশা তৈরির চেষ্টা করেছেন যা পরবর্তীকালে
বহুত্ববাদ বা মাল্টিকালচারলিজম নামে গোটা পৃথিবীতেই চেষ্টা করেছে অনেকে।
বুদ্ধদেবরাও এই পথের পথিক ছিলেন।
তাত্ত্বিক মৌলবাদের প্রবল প্রতাপ আমরা দেখে চলেছি। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে তা
যদি ডগম্যাটিক কমিউনিজম হয় তো তার পরবর্তীতে জ্ঞানতন্ত্র বা থিওক্রেসির যুগ শুরু
হয় যা এখনো চলছে। যে কোনো শিল্পীর এই অবস্থানগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
বুদ্ধদেব-এর লেখা পড়লে বোঝা যায় সারা জীবন ধরে এই সচেতনতা বজায় রেখেছেন। রাজনৈতিক,
সামাজিক ভাবনা চিন্তা বা আদর্শ তাঁর যাই হোক না কেন শিল্পের ক্ষেত্রে এক স্বাধীন ও
বহুত্বের বিষয়ে কখনো দিশাহীন ছিলেন না।
উনিশ শ’ নব্বই পরবর্তী সময়ে যে সোভিয়েত-এর পতন ও নতুন
বিশ্বায়নের সামনে আমরা দাঁড়ালাম, তাতে বুদ্ধদেবদের নতুন করে খুঁজতে হচ্ছে। একটা
বিরাট সময় আমাদের কেটেছে তাত্ত্বিক মৌলবাদের কবলে, কিন্তু তা দিয়ে সাহিত্যের নতুন
কোনো দিক বাংলা বা ভারতীয় সাহিত্যে আমরা খুঁজে পেয়েছি কি? বা যে নতুন পথ খোঁজাগুলো ছিল সেগুলোকে সামনের
সারিতে আনতে পেরেছি বা তাদের সঙ্ঘবদ্ধ করতে পেরেছি? বুদ্ধদেব-এর এই পথ চলাটা ছিল।
আমাদের আবার নতুন করে এই রাস্তায় নামতে হবে কোনো না কোনো সময়, এখানেই তাঁর
উত্তরাধিকার আমাদের জন্য।
১. আমার দেবোত্তর সম্পত্তি, নীরদ চন্দ্র চৌধুরী, আনন্দ
২. Remembering Buddhadev Bose, Ketaki Kushari Dyson, article published in Parabas
৩. Sudhindranath Dutta,
biographical sketches, Damayanti Basu singh, Parabas
৪. Remembering Buddhadev Bose, Ketaki Kushari Dyson, article published in Parabas
বাংলাদেশের কালি ও
কলম পত্রিকায় প্রকাশিত
ছবি ইন্টারনেট থেকে
সংগ্রহ



No comments:
Post a Comment