(জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাচ্ছেন অমিতাভ ঘোষ, এই প্রথম বোধহয় কোনো ইন্ডিয়ান
ইংলিশ-এ লেখা ভারতীয় লেখক পাচ্ছেন এই পুরস্কার। এবং যথাযথ প্রাপ্তি, ইংরেজিতে
লিখলেও অমিতাভ সম্পূর্ণ ভারতীয় এক লেখক একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকও বটে। এই বিরল গুণের লেখকের বইয়ের সমালোচনা লিখেছিলাম ‘আরম্ভ’ পত্রিকায় সেই প্রকাশিত
সেই লেখাটি নিচে তুলে দিলাম -)
একেকজন লেখক থাকে যাকে দেশকালের গণ্ডীর মধ্যে ধরা যায় না, তাদের লেখায় দেখতে
পাই তরতর করে বয়ে চলে সময়, আমাদের একটা মনোময় দিক ভ্রমণে ভাসিয়ে নিয়ে চলেন, আমরা
পাঠ শেষে ঋদ্ধ হয়ে উঠি। অমিতাভ ঘোষের লেখা পড়লে ঠিক তেমনি মনে হয়। অমিতাভ ঘোষ
বাঙলা ভাষায় লেখেন না, উত্তর ঔপনিবেশিক ইন্ডিয়ান ইংলিশ নভেল-এর একজন প্রতিষ্ঠিত
লেখক, অথচ কী অদ্ভুত তার লেখা কখনওই বাইরে থেকে দেখা কোনো লেখা নয়।
ইন্ডিয়ান ইংলিশ নভেলিস্ট বললেই
যেটা মনে হয়ে থাকে তা হল, একটা দূরত্ব। এর কারণও আছে। যেহেতু ইংরেজি ভাষাটা
ভারতীয়দের কোনো নিজস্ব ভাষা নয় বরং তা ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষা, যে ভাষায় কিপলিং
যথেষ্ট গালাগাল দিয়েছেন আমাদের কালো চামড়ার ‘নেটিভ’দের, যে ভাষায়
ফস্টার ‘প্যাসাজ টু ইন্ডিয়া’ লিখে বুঝিয়েছেন যে
কোনোদিনই ভারতীয়দের বোঝা শ্বেতাঙ্গদের সম্ভব নয়, ভাষা কাঠামোর সেই ভীতের উপর দাঁড়িয়ে
ভারতীয়রা যখন ইংরেজিতে লিখতে শুরু করে তখন তা একটা এলিয়েনেশন শুরু করতে বাধ্য।
স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতীয় ইংরেজি-র লেখকদের সমস্যাও সেখানে। তাদের উপন্যাসের
ভাষাটাই তো তাদের দেশের মানুষের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে, অথচ তাদের পড়াশোনা বা বড়
হওয়া বা সামাজিক অবস্থানের জন্য ইংরেজি হয়ে গেছে তাদের প্রথম ভাষা। এই গভীর
বিচ্ছেদ একটা বড় অংশের ভারতীয় লেখকদের মধ্যে পাওয়া যায় বিশেষ করে উপমন্যু
চ্যাটার্জির মতো লেখদের থেকে। অমিতাভ ঘোষের সেই সমস্যা যেন নেইই। কলকাতায়
জন্মেছেন, দুন স্কুল ও তারপর ইংল্যান্ডে পড়াশোনা অথচ তার উপন্যাসে ব্যক্তি লেখকের
কোনো ‘ডিসলোকেশন’ বা শিকড়হীনতার বোধ দেখা যায় না।
অমিতাভ ঘোষ উত্তর ঔপনিবেশিকতার সমস্যাকে দেখেন নৈর্ব্যক্তিক এক লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
লেখক অমিতাভ ঘোষকে আমার সবসময়ই মনে হয় নিজে শিকড় বিচ্ছিন্ন নন, আর তাই বোধহয় এই
সমস্যার থেকে নিজেকে বিচ্যুত করে তৈরি করতে পারেন উত্তর ঔপনিবেশিকতার একটা
সামগ্রিক ছবি, যা তার উপন্যাসের বিষয় হয়ে ওঠে।
প্রথম দিককার উপন্যাস শ্যাডো লাইনের কথাই ধরা যাক না। সীমান্ত ও হিংসা যে
পরিপূরক শব্দ হয়ে উঠেছে উপমহাদেশে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবাই বুঝতে পারছে এই গণ্ডী
কিভাবে বিভেদ তৈরি করছে, এবং সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে তার জন্য মানুষ শিকড়হীন হয়ে উঠছে
অথচ এই যে সীমান্ত রেখা এ তো সম্পূর্ণ মনগড়া, প্রকৃতি তো আমাদের মধ্যে এই সীমান্ত
তৈরি করেনি। বার বার এই কথাটা বলে উঠছে,
Why don’t they draw thousands of little lines through the subcontinent
and give every little place a new name? What would it change? It’s a mirage;
the whole thing is a mirage. How can anyone divide a memory?
কী আশ্চর্য! মনে হয় না, আরে এ তো ঋত্বিক ঘটকের কথা, এ তো কোমল গান্ধার,
দেখছি যেখানে বলে উঠছে, যোগ চিহ্ন আজ বিয়োগ চিহ্ন হয়ে উঠেছে। শুধু কী আমাদের
উপমহাদেশ? আজ যখন দেখি সিরিয়া থেকে অসংখ্য শরণার্থী দলে দলে চলেছে ইউরোপের দিকে,
তখনও কী এই কথাই মনে হয় না? গত সত্তর বছর ধরে তো এই ঘর ছাড়া মানুষের সংখ্যা বেড়েই
চলেছ এর শেষ কোথায়?
এরই মধ্যে দেখি ত্রিদিবের মতো মানুষেরা রয়েছে, শিক্ষিত, অনুভূতিপ্রবণ,
কিন্তু তাদের সবাই হেলাফেলা করে। মানুষ হিসেবে অনুভূতিপ্রবণ ও সৎ বলেই খাপ খাওয়াতে
পারে না, অথচ গল্পের মুখ্য চরিত্র যে নামহীন কথক তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, কারণ সে
বুঝতে পারে এই লোকটিই হয়তো এই ছায়া-রেখ বা শ্যাডো লাইনের তাৎপর্য।
অমিতাভ ঘোষ কিন্তু এখানেই থেমে যান না। একটা উপন্যাস শেষ হয় কিন্তু তার
অভিঘাত পরে পরবর্তী উপন্যাসে। ক্যালকাটা ক্রোমোজোম-এ দেখি এক কল্পবিজ্ঞানের
আঙ্গিকের মধ্যে দিয়ে খুঁজতে থাকেন এই বিযুক্তির কারণ। কি ভাবে ইতিহাস লেখা হয় তার
হাল হকিকত যেন দেখতে পাই। আমাদের ইতিহাসের যে বড় চলনটা রয়েছে যাকে গ্র্যান্ড
ন্যারেটিভ বলা হয়, তার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ খুঁজে পাই। বঙ্কিম লিখেছিলেন, হায় বাঙালি
তোমার ইতিহাস নাই। সেই কথার সূত্র ধরেই বুঝি যে আমরা যাকে ইতিহাস বলে জানি তা
আমাদের ঔপনিবেশিক শাসকদেরই সৃষ্টি। রোনাল্ড রস-এর ম্যালেরিয়ার ওষুধ আবিষ্কার, আসলে
হয়ে ওঠে ভারতীয় লোক সংস্কৃতি থেকে উঠে আসা এক গোপন কাল্ট-এর অবদান, যা নাকি ইতিহাসে
চেপে যাওয়া হয়েছে। এভাবে গল্পটি ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে অস্বীকার করে একটা কাল্পনিক
সমান্তরাল কথন তৈরি করে। এই উপন্যাসে দেখি কথনটি ক্রনোলজিকাল সিক্যুয়েন্স মানছে
না, আমাদের লোককথা, পুরাণ, আখ্যানগুলোও তো তেমনি ছিল। অমিতাভ ঘোষ সাহসের সঙ্গে তাই
যখন নির্দ্বিধায় সময়ের এই পরম্পরা ভেঙে দেন তখন এই আখ্যানটি পাশ্চাত্যের উপন্যাস
বা ঐতিহাসিক যে দর্শন তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
ঔপনিবেশিক হেজিমনির উৎপত্তি ও তার বিকাশকে এই ভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড়
করিয়েছেন অমিতাভ ঘোষ। গত প্রায় এক দশক ধরে তিনি তিনটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন,
যার শেষটি, ‘ফ্লাড অফ ফায়ার’ । ঐতিহাসিক উপন্যাস
বলতে আমরা যা বুঝি তার ধারণার সঙ্গে এই উপন্যাস মিলবে না। ধ্রুপদী ভাবে যে
রোমাঞ্চর উপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক উপন্যাসের সূচনা সেই ওয়াল্টার স্কট থেকে আমাদের শরদিন্দু,
তার থেকে এর ভাবনা আলাদা। উনিশ শতকের উপমহাদেশ ও যাকে বলা হত সুদূর প্রাচ্য
(অদ্ভুত নামকরণ, কারণ তা ইউরোপ থেকে দূরত্ব দিয়েই নির্ধারিত) সেই এশিয় ভূখণ্ডে
উপনিবেশ শাসনের সূচনা ও মার্কেন্টাইল অর্থনীতির ব্যাপক আগ্রাসনের ইতিহাস উপন্যাস
ত্রয়ীর আঙ্গিক।
আফিম চাষ ও আফিম যুদ্ধ ও ফ্রি ট্রেড-এর যে অর্থনীতির তার জোয়ালে পড়ে এই এত
বড় ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে আদান প্রদান কী ভাবে বদলে গেল, তা সবিস্তার এই ত্রয়ীর
মধ্যে উপাখ্যাত হয়েছে। আর অদ্ভুত ভাবে এর প্রধান চরিত্ররা আমাদের জানা মানুষদের
থেকে আলাদা, প্রান্তিক কিছু মানুষ যাদের উৎপত্তির কারণও ওই আর্থসামাজিক অবস্থা। বিহার-বঙ্গের
আফিম-কুঠির শ্রমিকে পরিণত হওয়া চাষি, রাজা নন্দকুমার-এর মতো জাল মামলায় ফাঁসা
ভাগ্যহত জমিদার, ইউরেশীয় বর্ণসংকর যাদের কোনো সমাজে নির্দিষ্ট অবস্থান নেই,
ভাগ্যান্বেষী মার্কিন নাবিক সব মিলিয়ে হঠাৎ পড়তে পড়তে মনে হয় একি উনিশ শতকের
মধ্যভাগ না আমদের সময়। মার্কেন্টাইল অর্থনীতি ও পুঁজিবাদের গর্ভেই লুকিয়ে ছিল
তাহলে বিশ্বায়নের প্রথম ধাপখানা!
এই ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হতে হতে আমরা বুঝে যাই কিভাবে ঔপনিবেশিক শাসন
শুধু আর নিছক একটা আর্থসামাজিক বা রাজনৈতিক পরিসরে আটকে থাকে না, তা বহু মানুষের জীবন
বদলে দিয়ে একটা সাংস্কৃতিক পালাবদল তৈরি করে। ইউরোপীয় আধুনিকতা ও তার সভ্যতার যে
দান আমাদের আলোকিত করে রাখে, তার জমি তৈরির অন্ধকার দিকটা স্পষ্ট হয়ে যায়। মুক্ত
বাণিজ্য-র আসল চেহারাটা দেখতে পাই, যখন বলে ওঠে ক্যন্টন বন্দরে আগে এশিয়ার সব দেশ
থেকেই বাণিজ্য তরী আসত, হরেক পসরা নিয়ে। ইউরোপীয়রা নিয়ে এল মুক্ত বাণিজ্য ও তার
সঙ্গে বানাল দুর্গ। এই যে মুক্ত বাণিজ্যের নামে অর্থনীতিকে গ্রাস করে ফেলা, এই
ছবিটা কবেকার তা নিয়ে ধন্দ জাগে। ঐতিহাসিক উপন্যাস হয়েও তা আমাদের সময়ের একটা
সমান্তরাল আখ্যান হয়ে ওঠে তখন।
নৌ বাণিজ্য ও নাবিকের অভিযানের উপাখ্যান পাশ্চাত্যের সাহিত্যে নতুন কোনো
ব্যাপার নয়। রেনেসাঁ থেকে জোসেফ কনরাড পর্যন্ত দেখা যায় এই লেখার চল। অমিতাভ এখানে
সেই উপাখ্যানের বিষয়টা উলটে দিয়েছেন, যাকে ইংরেজিতে বলে টার্নড দ্য টেবিল আর কি।
এখানে দেখার চোখটা বদলে যাচ্ছে। কোনো দুঃসাহসী অভিযান নয় পাশ্চাত্যের নৌবহর আসলে
আমাদের মহাদেশে আসছে অভিশাপ হিসেবে। যাদের উদ্দেশ্য মুক্ত বাণিজ্যের নামে, নানা
দেশ আবিষ্কারের নামে আসলে সেইসব দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা তাদের কব্জা করা। দৃষ্টিভঙ্গির
কী পার্থক্য! সেই কলম্বাস, ভাস্কো ডা গামা থেকে হার্মাদ জলদস্যু ইউরোপের কাছে
নায়ক, বিজয়ী বীর, অভিযাত্রী। আমরাও সেই ঔপনিবেশিক ধারণা বিশ্বাস করতে শিখে গেছি,
কারণ তা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে তাদের লম্বা শাসনকাল। আফিম যুদ্ধ, মুনাফার লোভ,
নৌ বাণিজ্য এগুলো যে সবই আসলে একটা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসনের কারণ সেই
ধারণাকে সামনে এনে অমিতাভ সম্পূর্ণ একটা সমান্তরাল পাঠ তৈরি করেছেন এই উপন্যাস
ত্রয়ীর মধ্যে, যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আরো ভাল লাগে যখন দেখি এই যে এক বিশাল ইতিহাসের সফর অমিতাভ করলেন তার
কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু তার নিজের দেশ, নিজের শিকড়। তার গল্পের মধ্যে দেখতে পাই নিখুঁত
বর্ণনায় উঠে আসে শহর কলকাতার দৃশ্য, যেখানে ভোরবেলা ঝাঁকা মাথায় মাছওলা হাঁক পারে,
ঘোরে পাড়ায় পাড়ায়। এমন সাধারণ দৈনন্দিন ঘটনাও তার চোখ এড়িয়ে যায় না। অথবা দেখি যখন
লোকাল ট্রেনের দীর্ঘ বর্ণনা ডায়মন্ড হারবার ও সুন্দরবন যাওয়ার পথের দৃশ্য। বা
লঞ্চের মাঝি মাল্লার বর্ণনা - এসব জীবন্ত হয়ে ওঠে। অমিতাভ ঘোষ তাই ইংরেজি ভাষার
লেখক হলেও আনখশির একজন ভারতীয় লেখক, বাঙালি লেখক।
ভারতীয়
রাগ সঙ্গীত যেমন একটা ধারণাকে কেন্দ্র করে নানা শাখা প্রশাখায় নিজেকে মেলে ধরে,
তেমনভাবে অমিতাভ ঘোষের লেখাও তার ভারতীয় আইডেন্টিটির কেন্দ্র থেকে বিস্তার শুরু
করে উপমহাদেশ ছাড়িয়ে এশিয় ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। নানা মিল অমিল, ভাব ভালবাসা বা
স্বার্থ সংঘর্ষ দিয়ে গড়া একটা অন্তর্লীন যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় সামগ্রিকভাবে।
শুধু ভিন্ন ভৌগলিক অঞ্চলের মানুষ নয় বা ভিন্ন অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর মানুষের মধ্যে,
এমনকি এই ভিন্ন সময়ের মানুষের মধ্যেও দেখতে পাই একটা সম্পর্ক রয়েছে। এই যে একটা
বহমানতা রয়েছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের খণ্ডিত অস্তিত্ব একটা বিরাট
ভৌগলিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অংশ, এবং আমাদের মনের পরিধির বিস্তারে
সাহায্য করে।
প্রকাশিত: আরম্ভ পত্রিকা



No comments:
Post a Comment