দুশোয় দস্তয়েভস্কি: আধুনিক মানুষের আর্তির রূপকার
জার শাসিত রাশিয়ায় তাঁর জন্ম, সেই রাশিয়া যাকে
পশ্চিম ইউরোপ বলে আধা-এশিয়া আধা-ইউরোপ অর্থাৎ দোআঁশলা, ড্যানিউব নদীর পশ্চিমপারে
তখনো শিল্প বিপ্লব জাঁকিয়ে বসেনি, তার সমাজ তখনো সামন্ততান্ত্রিক – বাংলায় রামমোহনের
পৃথিবী আর দস্তয়েভস্কির মস্কো-সেন্ট পিটার্সবার্গ খুব আলাদা নয়। গোঁড়া ধর্মভীরু,
রক্ষণশীল একটা সমাজ যা পশ্চিম-ইউরোপীয় আধুনিকতার ধাক্কায় কাঁপছে, চিনে নিতে চেষ্টা
করছে নিজেকে। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, তুর্গানিভরা এমন দ্বৈত পৃথিবীর সন্তান। আমরা
হয়তো তাই তাদের বাকি ইউরোপীয়দের থেকে একটু বেশি কাছের হিসেবে দেখি, আমাদের মনের
কাছের আত্মীয় তারা। কী আশ্চর্য এই পরিস্থিতিতেই বিশ্ব সাহিত্যের কথা-সাহিত্য
বিভাগে আধুনিকতার সৃষ্টি করে ফেললেন তাঁরাই, আর তাদের প্রধান পুরুষ, তলস্তয়কে
মাথায় রেখেও বলা যায়, দস্তয়েভস্কি। এ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর এক বাক্যই যথেষ্ট ‘বিশ-শতকী আধুনিক
সাহিত্যের ধারনাকে সৃষ্টি করলেন তাঁরা, বিশ-শতকী আধুনিক মানুষকে জন্ম দিলেন।’ তাঁরা বলতে বুদ্ধদেব বসু বলছেন ফ্রান্সে বোদল্যের ও
রাশিয়ায় দস্তয়েভস্কি। প্রসঙ্গত দুজনের জন্মই একই বছরে। আধুনিকতার প্রসব যন্ত্রণা এঁরা
ভোগ করেছেন সারা জীবন দিয়ে।
সমাজ ও রাষ্ট্র দুই যখন বিশাল এক টানাপোড়েনের
মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ব্যক্তি জীবনে তার অভিঘাত পড়বে না এ-কি হয়? একদিকে দস্তয়েভস্কি
মাকে হারাচ্ছেন কম বয়সে, বাবার রহস্যজনক মৃত্যু হয়তো এক প্রজার হাতে, মৃগীরোগে
আক্রান্ত হচ্ছেন, রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যে অপরাধে মৃত্যুদণ্ড থেকে শেষ মুহূর্তে
রেহাই, তারপর সাইবেরিয়ায় ভয়ঙ্কর নির্বাসন। এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন দস্তয়েভস্কি তাও প্রেমে
পড়ছেন বারবার, জুয়ো খেলে সর্বস্ব হারাচ্ছেন – এ নিছক ব্যক্তিগত
উৎকেন্দ্রিকতা নয় – এ যুগ-যন্ত্রণা যা আমাদের ঋত্বিক ঘটককে মাতাল করে,
জীবনানন্দকে আত্মহত্যা-প্রবণ। সন্ত থেকে পাপীতে নিজেকে আবিষ্কার করা আধুনিক লেখকদের সবচেয়ে বড় দিক-নির্দেশ, আর দস্তয়েভস্কি সেই প্রথম পবিত্র পাপীদের
অন্যতম।
দস্তয়েভস্কির রাশিয়ায় দেখা যাচ্ছে আমাদের
রেনেসাঁসের মতোই একদল তরুণ সংস্পর্শে আসছে আধুনিক চিন্তার ও যুক্তিবাদের দর্শনের।
তাদের দেশ কুসংস্কার ও জারতন্ত্রের শোষণে গলা পর্যন্ত ডুবে। সামরিক ও ধর্মীয়
কলকাঠি এই শোষণের উপায় আর অশিক্ষিত ও গ্রামীণ সংখ্যাগুরু সে সম্পর্কে উদাসীন যেমন
আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে হয়। ধর্ম ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী শিক্ষা
ও হেগেলীয় দর্শন সেই অলোক-প্রাপ্ত তরুণদের জাগিয়ে তুলল এবং তারা এই কুসংস্কার ও
ধর্মীয় শোষণের বিরুদ্ধে নিহিলিজম ও অ্যানার্কিকে বেছে নিল। মার্কসীয় সাম্যবাদী
দর্শনের আগে গোটা ইউরোপেই তখন ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ছিল অ্যানার্কিস্ট
সাম্যবাদীরা। বাকুনিন, নেচায়েভরা রাশিয়ায় একইভাবে শুরু করলেন জার সামন্ততন্ত্র ও
চার্চের অপশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই – এ লড়াই সে সময়ের সাধারণ অশিক্ষিত
পৃথিবী-বিচ্ছিন্ন গরীব রাশিয়ানরা বোঝেনি এবং বোঝা সম্ভবও ছিল না, কিন্তু কালেজ পাস
মুষ্টিমেয়র হাত ধরে এ আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং এরা না থাকলে লেনিন, স্ট্যালিন, আলেকজান্দ্রা
কলোনতাই ও নেদেজডা ক্রুপস্কায়ার মতো পরবর্তী বলশেভিক বিপ্লবের নায়ক নায়িকাদের
পাওয়া যেত না, যাঁরা সেই সাধারণ রাশিয়ানদের মধ্যে থেকে ও সঙ্গে নিয়ে বিপ্লব সফল
করতে পেরেছিলেন। তাঁদের পূর্বসূরি উনিশ শতকের
মধ্যভাগের এই মুষ্টিমেয় নিহিলিস্ট অ্যানার্কিস্টদের আদর্শ আদল পেতে গেলে
তুর্গেনেভের ফাদারস অ্যান্ড সন্স উপন্যাসের নায়ক বাজারভকে দেখলেই বোঝা যাবে।
দস্তয়েভস্কি কিন্তু কখনওই সম্পূর্ণ সেই পথে হাঁটলেন না। তুর্গেনিভ ও রাশিয়ান আধুনিক ইউরোপ্রেমীদের নিয়ে দস্তয়েভস্কির সংশয় ছিল। দস্তয়েভস্কি একইসঙ্গে রাশিয়ার মরমিয়া ইতিহাস ও ইউরোপের যুক্তিবাদী দর্শনের ধারক ও বাহক। এই দুয়ের টানাপড়েন তাঁর মধ্যে ছিল বলেই তাঁর লেখা পেল অন্য মাত্রা। তিনি ছিলেন আস্তিক, এবং যিশুর ধর্মের যে সাম্য সেই সাম্যের আদর্শে বিশ্বাসী বলেই জার ও চার্চের অপশাসনকে মেনে নেননি।
সামরিক চাকরি জীবনে মানিয়ে নিতে না পেরে লেখক
হিসেবে জীবিকা শুরুর প্রথম দিকেই তিনি ইউরোপীয় সাম্যবাদী দর্শনের চর্চায় ফুরিয়ার,
প্রুদহন ইত্যাদি সমসাময়িকদের মতাদর্শে উৎসাহী হন। কিন্তু তিনি নাস্তিক হননি
সম্পূর্ণভাবে এবং ভাগ্যের পরিহাস যে গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য তাঁর প্রায়
ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রাণটা যাচ্ছিল এবং অসম্ভব কঠোর সাইবেরীয় নির্বাসন যন্ত্রণা ভোগ
করতে হয় তার সম্পর্কে বিপ্লবী বাকুনিনের ঠাট্টা ছিল রাশিয়ার সবচেয়ে নিরীহ গোষ্ঠী
যারা বিপ্লবকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে! স্বৈরাচারের চেহারাই আসলে এইটা যে তারা অহিংস
নিরীহ সমাজকর্মী আর বিপ্লবীর পার্থক্য বোঝে না, সে সবাইকেই ঘৃণা করে ও শেষ করে
দিতে চায়। দস্তয়েভস্কি প্রাণে বাঁচলেন কিন্তু সাইবেরিয়ায় সশ্রম নির্বাসনে গেলেন,
সেই বরফ ঠান্ডা রুক্ষ কষ্টকর শিবিরে দেখলেন জীবন। অপরাধীদের মধ্যে আবিষ্কার করলেন
মানুষের দুঃখময় অস্তিত্বকে। একই সঙ্গে মানুষ পাপী ও পবিত্র, সমাজ এক ব্যক্তির
সমস্ত ভালোত্বকে কীভাবে শেষ করে দিতে চেষ্টা করে আর তার মধ্যেও মানুষের মনুষ্যত্ব
টিঁকে থাকে।
কিন্তু দস্তয়েভস্কি শুধুমাত্র মরমিয়া লেখক হয়ে
উঠলেন না তা সত্বেও – বরং তিনি খুঁড়ে দেখতে লাগলেন মানুষ নামের সেই আশ্চর্যকে,
শেক্সপিয়ারের ডেনমার্কের রাজপুত্তুর যাকে বলেছিল হোয়াট আ পিস অফ ওয়র্ক। ঘটনার
ঘনঘটাপূর্ণ সাবেকি উপন্যাসের খোল নলচে পালটে তিনি তা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতের
ছবি আঁকলেন। ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর মতো উপন্যাস যা
ঘটনা ও চরিত্রের বাইরের বর্ণনার থেকেও তার অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি, গল্প বলার
প্যাঁচ-পয়জার নেই বরং ঢিলেঢালা, যেন তার সে বিষয়ে আগ্রহই নেই। একজন ফ্ল্যাটের বেসমেন্টে
থাকা নামহীন চরিত্রের স্বগতোক্তি – এ উপন্যাস যেমন পরবর্তীতে জয়েস ও ভার্জিনিয়া উলফের মতো
স্ট্রিম অফ কনশাসনেস বা চেতনাপ্রবাহমূলক উপন্যাসের বীজ তেমনি কাফকার অনামা ‘কে’ নামক নায়কের পূর্বসূরি। দস্তয়েভস্কি সেই প্রথম আধুনিকদের একজন যিনি
বুঝেছিলেন ব্যক্তি মানুষের জীবন কি-ভাবে পূর্ণতার
থেকে দূরে সরে যাচ্ছে পুঁজিবাদী ও শিল্পবিপ্লব পরবর্তী পৃথিবীতে যা আমাদের সময়ে
হাড়ে হাড়ে টের পাই আমরা। এবং সে মানুষ অসহায় হলেও নিরপরাধ নয়। ক্রাইম অ্যান্ড
পানিশমেন্ট তিনি লিখতেন না তাহলে।
দস্তয়েভস্কি প্রবল খৃষ্টীয় বিশ্বাসী হলেও কোনো
মরমী-লোক সাহিত্যিক নন – বিনা অপরাধে দণ্ডিত হয়েছিলেন যে আদর্শের জন্য তাঁর
সম্যক জ্ঞান হয়েছিল – নাহলে লেখা যায় না ‘ক্রাইম অ্যান্ড
পানিশমেন্ট’। প্রবল দারিদ্রের থেকে রেহাই পেতে রাসকোলনিকভ
এক বৃদ্ধা বন্ধকের-কারবারিকে খুন করে টাকার জন্য। মেধাবী ও দার্শনিক খুনি
রাসকোলনিকভের মনের অবস্থা ও নানা তর্ক-বিতর্ক যেমন দেখতে পাই তেমনি দস্তয়েভস্কির প্রশ্ন
তার সময়ের রাজনৈতিক দর্শনের। যদি সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনৈতিক হয় তাহলে
ব্যক্তির কোনো অপরাধ না করার নৈতিক দায় আছে কি-না? হয় নৈতিকতার সাম্য থাকবে সবার
জন্য নয়তো রাষ্ট্র বা সমাজের নিয়ম মেনে চলা ব্যক্তির দায় নেই, সে নিজ প্রয়োজনে
হিংস্রতম কাজও করতে পারে সমাজকে ধ্বংস করতে।
এই প্রশ্ন এই দু-শো বছর পরেও এখনো আমাদের কাছে
যেন আজকের প্রশ্ন এক ব্যক্তি যখন দেখে তার
সমাজ ও রাষ্ট্র জুলুমশাহীর মধ্যে দিয়ে সমস্ত নৈতিকতা হারিয়েছে সেই সমাজ বা
রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে। ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট সাহিত্যের
বিস্ময় আমরা যারা লেখালিখি করি তাদের কাছে তার শৈলী পাঠ্যবইয়ের মতো, এই উপন্যাসকে
কেন্দ্র করে বাখতিন গড়ে তুলবেন পরবর্তীতে তার বহুস্বরীয় উপন্যাসের তত্ত্ব যার
গুরুত্ব আধুনিক ও আধুনিকোত্তর লেখক ও সমালোচকদের কাছে অপরিসীম। এবং এও সত্যি যে
দস্তয়েভস্কির উপন্যাস সম্পর্কে আমি লিখলাম একটু আগে যে ঢিলেঢালা এবং প্লটে
অমনোযোগী, এ অভিযোগ তাঁর সমসময়ে ছিল – ‘ক্রাইম অ্যান্ড
পানিশমেন্ট’-এ দেখা যায় তিনি আসলে কতটা পটু ছিলেন – এ উপন্যাস কোনো ক্রাইম
থ্রিলারের থেকে কম যায় না। এ এক রুদ্ধশ্বাস টানটান উপাখ্যান। এহ বাহ্য, এই সব
পেরিয়ে দস্তভয়েস্কি আমাদের কাছে থেকে যান তাঁর ওই ভাবনার স্তরগুলো নিয়ে যা এখনো
একজন লেখক ও পাঠককে সমস্যায় ফেলে।
দস্তয়েভস্কি এই খণ্ডিত মানব-অস্তিত্ব বুঝেছিলেন বই-পড়া তত্ত্ব বা নৈর্বক্তিক ভাবনা-চিন্তার মাধ্যমে নয়, সত্যিকারের লেখকের মতো তিনি তা উপলব্ধি করেন নিজের জীবনযাপনে। যে সমাজব্যবস্থা কদর্য ও শোষক সেই সমাজে অনুভূতিশীল ব্যক্তির নিজেকে পোড়ানো ছাড়া কি-করার থাকতে পারে? তিনি অনিয়ন্ত্রিত জীবনে ভেসে জুয়ায়, নেশায়, প্রেমে ডুবে নিজেকে শেষ করলেন। এর জন্য দারিদ্র্য তাঁর পিছু ছাড়েনি এবং টাকা-পয়সা কিঞ্চিৎ জুটলে তা ফুঁকে দিতেও পরোয়া করেননি। খৃষ্টীয় বিশ্বাস বা সাম্যবাদী দর্শন এই দুয়ের থেকেই তিনি বুঝেছিলেন ব্যক্তি-মালিকানা ও পুঁজির নিপীড়ন ক্ষমতা। আর লেখক নিজে যা তাঁর বইয়ে লিখছেন তাকে নিজের জীবনে প্রয়োগ করবেন না এমন সামান্য-বুদ্ধির বাজারি হলে দস্তয়েভস্কি হয়ে উঠতে পারা যায় না, তাই লেখা ও জীবন দুয়েই তিনি প্রবলভাবে এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে পরীক্ষা চালিয়ে গেলেন। এই ব্যাপারটা ধরতে পারলে বোঝা যায় আজ দু-শো বছর পরেও মানুষ কেন দস্তয়েভস্কির কথা বলে। এ ক্ষমতা সবার থাকে না, সাহসও হয় না। তাই দু-শো বছর পরের পৃথিবীতেও আমরা যখন ব্যক্তিকে দেখছি তার সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে এক অসম আদানপ্রদানে, আমাদের খুঁজে নিতে হয় দস্তয়েভস্কির কারমাজভ, রাস্কলনিকভ এবং আরো অসংখ্য চরিত্রকে। তাই তাঁকে পড়া আমাদের ফুরোয় না বরং আবার করে ফিরে যেতে হয়।
প্রকাশিত: দৈনিক সংবাদ, ত্রিপুরা
২
দস্তয়েভস্কি বলে আসলে কেউ নেই
একজন লেখকের দুশো বছর পেরিয়ে গেলে তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু লেখার থাকে না তার উত্তরসূরি লেখকদের, একমাত্র নিজ পাঠ-অভিজ্ঞতা ছাড়া, কারণ সুরৎহালের কাজটা করে ফেলেছে ততদিনে ঐকিক ক্রিটিক, এমন-কি তাদের বক্তব্য পৌঁছে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে, জাবর-কাটিয়ে অধ্যাপকেরা পড়িয়ে, নোটস লিখিয়ে ও সেমিনারে, পেপারে উগরে দিয়ে বহাল তবিয়ত। সে হিসেবে দেখলে বলতেই হয় দস্তয়েভস্কি বলে কেউ আসলে নেই।
হ্যাঁ, দস্তয়েভস্কি বলে কেউ নেই এ-কথা লিখলাম – কারণ যা আমি লিখছি তা আমার নিজ পাঠ বৈ আর কিছু নয় – তাত্ত্বিক প্রবন্ধ লিখতে আমি নারাজ আর বুদ্ধদেব বসুর যে কাল-নৈকট্যের কারণে দস্তয়েভস্কি বা বোদল্যের নিয়ে উত্তেজক ও প্ররোচনামূলক লেখা প্রয়োজন ছিল আধুনিকতার ভগীরথ হওয়ার জন্য তা এখন নিষ্প্রয়োজন। তাই আমি যে দস্তয়েভস্কির কথা লিখব তা একান্ত আমার মনের মধ্যে যে দস্তয়েভস্কি তৈরি হয়েছে তারই কথা। পাঠক, আপনার যদি তাতে আগ্রহ না থাকে তাহলে এখানেই এই লেখাটি থেকে বিদায় নিতে পারেন, তাতে লেখক ক্ষুণ্ণ হবেন না কারণ জ্ঞান-বিতরণ ও পরীক্ষা বা গবেষণার উত্তরণ প্রচেষ্ট কোনো ফরমাইশ এখানে অমিল, এখানে যা থাকবে সামান্য রসের কথা, রসিকের কথা।
দস্তয়েভস্কির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ নিতান্ত পড়ুয়া বয়সে, ইস্কুলের গণ্ডি
ডিঙিয়ে কালেজে ঢুকেছি, এক মলাট সার্ত্র, দু-মলাট কাম্যু পড়লেও ইঙ্গ-আমেরিকান
সাহিত্য বাদে বিশেষ কিছু জানি না, এমতাবস্থায় দস্তয়েভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড
পানিশমেন্ট হাতে এসে পড়ে। এবং ঠিক সে সময়ই ঘটিল পরমাদ, ভাইরাল জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে
ঘরবন্দি। এ অবস্থায় এমন কেতাব যে পড়ার কথা নয় সে কথা এ যুবককে কেউ বলেনি। জ্বরের
ঘোরের মধ্যে রাসকলনিকভের কারনামা যে জগতে নিয়ে গেল তার অবলেশ আমি আর পাইনি কখনো।
সে এক বিকার যেন। উপন্যাসটা শেষ বোধহয় করতে পারিনি সে অবস্থায়, কিন্তু সেই মাথার
ভিতরে যে আখ্যান চলচ্চিত্রের মতো গেঁথে গেল তার জ্বর আর সারল না, শারীরিক জ্বরের
থেকে মুক্তি পেলেও। শুধু ছায়াছবির মতো গল্পটাকে দেখতে পেলাম তা নয়, রাসকলনিকভের
আত্মার সঙ্গে যেন নিজের আত্মা মিলে গেল – নিজেকে আবিষ্কার করলাম সমাজে
অব্যবহার্য্য, একক ব্যক্তিসত্তা হিসেবে যার কোনো দায় নেই আর সেই না থাকার
অনৈতিকতায় অপরাধবোধে দীর্ণ।
রাসকলনিকভের মতো কয়েকদিন কলকাতার রাস্তায় ঘোরা গেল তারপর, একুশ শতকের প্রথম
বা দ্বিতীয় বছর হবেও বা, এ এক তীব্র, অনুচ্চার অনুভূতি নিয়ে কাটানো, একটা অবিরাম
মাতাল অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করা রাসকলনিকভের ছায়ার মতো। এমন অভিজ্ঞতা অবরে সবরে
ঘটে, কিন্তু সেই আমি কে? রাসকলনিকভের মতো এক যুবক ছাত্র, না-কি দস্তয়েভস্কিরই
ছায়া। এই ছায়াখানা পেলাম কোথা থেকে?
একুশ শতকের শুরুর কলকাতা আর উনিশ শতকের মাঝের সেন্ট পিটার্সবার্গ-এর মধ্যে
তৎকালীন সেই যুবক আমি কী মিল খুঁজে পেয়েছিল তার পেঁচালটা এখানে বিস্তারে পাড়ব না,
সংক্ষেপে বললে নাগরিক খণ্ড জীবনের উপলব্ধি। অন্যত্র লিখেছি কেন বোদল্যের, কেন উনিশ শতকের আধুনিকদের
নিয়ে বুদ্ধদেব বসু বা সুধীন দত্তরা যাই লিখুন না কেন (সে লেখা সে পাণ্ডিত্য ও রস
আমাদের আর হবে কি-না সন্দেহ যদিও) অভিজ্ঞতাতে সেই শক অফ দ্য নিউ কাটানোর জন্য
তাদের কাছে মজুত ছিল ভারতীয় গ্রাম-সমাজের অবশেষ যা একেবারে আমাদের মতো দিশেহারা
আওকাতে পৌঁছে দেয়নি তাদের। আমরা বিশ্বায়ন ও টেকনোলজির বিপ্লবের পর যার শুরু বিশ
শতকের শেষ দশকে টের পেতে শুরু করলাম হাড়ে-মজ্জায় সে শহর হোক বা গ্রাম মফস্বল থেকে
আসা প্রত্যেকেই, সে সাহিত্য শিল্প বুঝি ছাই না বুঝি, তার গিনিপিগ। এ-সব যুক্তি
দিয়ে যে সে বয়সে বুঝেছিলাম এমন কথা বলছি না, বোঝার কথাও নয়, কিন্তু ওয়াল্টার
বেঞ্জামিন ইত্যাদি পড়লে ও ‘আধুনিক সাহিত্য’ নামের বস্তুটির
ইতিহাস ভূগোল নিয়ে চর্চা করলে এ সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব তবে তা চর্চা-সাধ্য অবশ্যই। কিন্তু
কোনো লেখকের লিখন-উপভোগের মর্মে প্রবেশিকা হিসেবে ব্যক্তি পাঠকের অভিজ্ঞতা ও
অনুভূতিই পাথেয় হওয়া ভাল। দুশো বছরে দস্তয়েভস্কিকে কীভাবে দেখছি বলতে গেলে আগে তার
সঙ্গে হেস্তনেস্তর শুরুটা সেভাবেই হয়।
বিলাতি পণ্ডিত যদিও বলে দিয়েছে আধা শতাব্দী আগে অথর ইজ ডেড বা লেখক মৃত,
আমাদের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘যে লেখে সে আমি নই...’ তবু আমরা একেবারে এ-দুইকে আলাদা করতে পারি না – মন চায় না। বিশেষ
করে কোনো লেখক যদি দস্তয়েভস্কির মতো হন, আমাদের মতো তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষ-পরে
জন্মানো গল্প-লিখিয়েদেরও জোর হাত হয় তাঁর সামনে। লেখা ও লেখক আমার কাছে সেট থিওরির
দুই গোলকের মতো যারা পরস্পরকে ভেদ করে গেছে, কিছুটা তাদের এক আবার কিছুটা আলাদা।
জার শাসিত রাশিয়ায় তাঁর জন্ম, সেই রাশিয়া যাকে পশ্চিম ইউরোপ বলে আধা-এশিয়া
আধা-ইউরোপ অর্থাৎ দোআঁশলা, ড্যানিউব নদীর পশ্চিমপারে তখনো শিল্প বিপ্লব জাঁকিয়ে
বসেনি, তার সমাজ তখনো সামন্ততান্ত্রিক – বাংলায় রামমোহনের পৃথিবী আর
দস্তয়েভস্কির মস্কো-সেন্ট পিটার্সবার্গ খুব আলাদা নয়। গোঁড়া ধর্মভীরু, রক্ষণশীল
একটা সমাজ যা পশ্চিম-ইউরোপীয় আধুনিকতার ধাক্কায় কাঁপছে, চিনে নিতে চেষ্টা করছে
নিজেকে। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, তুর্গানিভরা এমন দ্বৈত পৃথিবীর সন্তান। আমরা হয়তো
তাই তাদের বাকি ইউরোপীয়দের থেকে একটু বেশি কাছের হিসেবে দেখি, আমাদের মনের কাছের
আত্মীয় তারা। কী আশ্চর্য এই পরিস্থিতিতেই বিশ্ব সাহিত্যের কথা-সাহিত্য বিভাগে
আধুনিকতার সৃষ্টি করে ফেললেন তাঁরাই, আর তাদের প্রধান পুরুষ, তলস্তয়কে মাথায় রেখেও
বলা যায়, দস্তয়েভস্কি। এ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর এক বাক্যই যথেষ্ট ‘বিশ-শতকী আধুনিক
সাহিত্যের ধারণাকে সৃষ্টি করলেন তাঁরা, বিশ-শতকী আধুনিক মানুষকে জন্ম দিলেন।’ তাঁরা বলতে
বুদ্ধদেব বসু বলছেন ফ্রান্সে বোদল্যের ও রাশিয়ায় দস্তয়েভস্কি। প্রসঙ্গত দুজনের
জন্মই একই বছরে। আধুনিকতার প্রসব যন্ত্রণা এঁরা ভোগ করেছেন সারা জীবন দিয়ে।
সমাজ ও রাষ্ট্র দুই যখন বিশাল এক টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ব্যক্তি
জীবনে তার অভিঘাত পড়বে না এ-কি হয়? একদিকে দস্তয়েভস্কি মাকে হারাচ্ছেন কম বয়সে,
বাবার রহস্যজনক মৃত্যু হয়তো এক প্রজার হাতে, মৃগীরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, রাষ্ট্রদ্রোহের
মিথ্যে অপরাধে মৃত্যুদণ্ড থেকে শেষ মুহূর্তে রেহাই, তারপর সাইবেরিয়ায় ভয়ঙ্কর
নির্বাসন। এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন দস্তয়েভস্কি তাও প্রেমে পড়ছেন বারবার, জুয়ো খেলে
সর্বস্ব হারাচ্ছেন – এ নিছক ব্যক্তিগত উৎকেন্দ্রিকতা নয় – এ যুগ-যন্ত্রণা যা
আমাদের ঋত্বিক ঘটককে মাতাল করে, জীবনানন্দকে আত্মহত্যা-প্রবণ। সন্ত থেকে পাপীতে নিজেকে আবিষ্কার করা আধুনিক
লেখকদের সবচেয়ে বড় দিক-নির্দেশ, আর
দস্তয়েভস্কি সেই প্রথম পবিত্র পাপীদের অন্যতম।
সমাজ ও রাষ্ট্র দুই যখন বিশাল এক টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ব্যক্তি
জীবনে তার অভিঘাত পড়বে না এ-কি হয়? একদিকে দস্তয়েভস্কি মাকে হারাচ্ছেন কম বয়সে,
বাবার রহস্যজনক মৃত্যু হয়তো এক প্রজার হাতে, মৃগীরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন,
রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যে অপরাধে মৃত্যুদণ্ড থেকে শেষ মুহূর্তে রেহাই, তারপর
সাইবেরিয়ায় ভয়ঙ্কর নির্বাসন। এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন দস্তয়েভস্কি তাও প্রেমে পড়ছেন
বারবার, জুয়ো খেলে সর্বস্ব হারাচ্ছেন – এ নিছক ব্যক্তিগত উৎকেন্দ্রিকতা নয় – এ যুগ-যন্ত্রণা যা
আমাদের ঋত্বিক ঘটককে মাতাল করে, জীবনানন্দকে আত্মহত্যা-প্রবণ। সন্ত থেকে পাপীতে নিজেকে আবিষ্কার করা আধুনিক
লেখকদের সবচেয়ে বড় দিক-নির্দেশ, আর
দস্তয়েভস্কি সেই প্রথম পবিত্র পাপীদের অন্যতম।
দস্তয়েভস্কির রাশিয়ায় দেখা যাচ্ছে আমাদের রেনেসাঁসের মতোই একদল তরুণ
সংস্পর্শে আসছে আধুনিক চিন্তার ও যুক্তিবাদের দর্শনের। তাদের দেশ কুসংস্কার ও জার-তন্ত্রের
শোষণে গলা পর্যন্ত ডুবে। সামরিক ও ধর্মীয় কলকাঠি এই শোষণের উপায় আর অশিক্ষিত ও গ্রামীণ
সংখ্যাগুরু সে সম্পর্কে উদাসীন যেমন আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে হয়। ধর্ম ও
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী শিক্ষা ও হেগেলীয় দর্শন সেই অলোক-প্রাপ্ত তরুণদের
জাগিয়ে তুলল এবং তারা এই কুসংস্কার ও ধর্মীয় শোষণের বিরুদ্ধে নিহিলিজম ও অ্যানার্কিকে
বেছে নিল। মার্কসীয় সাম্যবাদী দর্শনের আগে গোটা ইউরোপেই তখন ক্ষমতার বিরুদ্ধে
লড়াইয়ে ছিল অ্যানার্কিস্ট সাম্যবাদীরা। বাকুনিন, নেচায়েভরা রাশিয়ায় একইভাবে শুরু
করলেন জার সামন্ততন্ত্র ও চার্চের অপশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই – এ লড়াই সে সময়ের
সাধারণ অশিক্ষিত পৃথিবী-বিচ্ছিন্ন গরীব রাশিয়ানরা বোঝেনি এবং বোঝা সম্ভবও ছিল না,
কিন্তু কালেজ পাস মুষ্টিমেয়র হাত ধরে এ আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং এরা না থাকলে লেনিন,
স্ট্যালিন, আলেকজান্দ্রা কলোনতাই ও নেদেজডা ক্রুপস্কায়ার মতো পরবর্তী বলশেভিক
বিপ্লবের নায়ক নায়িকাদের পাওয়া যেত না, যাঁরা সেই সাধারণ রাশিয়ানদের মধ্যে থেকে ও
সঙ্গে নিয়ে বিপ্লব সফল করতে পেরেছিলেন।
তাঁদের পূর্বসূরি উনিশ শতকের মধ্যভাগের এই মুষ্টিমেয় নিহিলিস্ট অ্যানার্কিস্টদের
আদর্শ আদল পেতে গেলে তুর্গেনেভের ফাদারস অ্যান্ড সন্স উপন্যাসের নায়ক বাজারভকে
দেখলেই বোঝা যাবে।
দস্তয়েভস্কি কিন্তু কখনওই সম্পূর্ণ সেই পথে হাঁটলেন না। তুর্গেনিভ ও
রাশিয়ান আধুনিক ইউরোপ্রেমীদের নিয়ে দস্তয়েভস্কির সংশয় ছিল। দস্তয়েভস্কি একইসঙ্গে
রাশিয়ার মরমিয়া ইতিহাস ও ইউরোপের যুক্তিবাদী দর্শনের ধারক ও বাহক। এই দুয়ের টানাপড়েন
তাঁর মধ্যে ছিল বলেই তাঁর লেখা পেল অন্য মাত্রা। তিনি ছিলেন আস্তিক, এবং যিশুর
ধর্মের যে সাম্য সেই সাম্যের আদর্শে বিশ্বাসী বলেই জার ও চার্চের অপশাসনকে মেনে
নেননি।
সামরিক চাকরি জীবনে মানিয়ে নিতে না পেরে লেখক হিসেবে জীবিকা শুরুর প্রথম
দিকেই তিনি ইউরোপীয় সাম্যবাদী দর্শনের চর্চায় ফুরিয়ার, প্রুদহন ইত্যাদি
সমসাময়িকদের মতাদর্শে উৎসাহী হন। কিন্তু তিনি নাস্তিক হননি সম্পূর্ণভাবে এবং
ভাগ্যের পরিহাস যে গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য তাঁর প্রায় ফায়ারিং স্কোয়াডে
প্রাণটা যাচ্ছিল এবং অসম্ভব কঠোর সাইবেরীয় নির্বাসন যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় তার সম্পর্কে
বিপ্লবী বাকুনিনের ঠাট্টা ছিল রাশিয়ার সবচেয়ে নিরীহ গোষ্ঠী যারা বিপ্লবকে দূরে
ঠেলে দিচ্ছে! স্বৈরাচারের চেহারাই আসলে এইটা যে তারা অহিংস নিরীহ সমাজকর্মী আর
বিপ্লবীর পার্থক্য বোঝে না, সে সবাইকেই ঘৃণা করে ও শেষ করে দিতে চায়। এ জিনিস আজকে
আমাদের নিজেদের সময়েও আমাদের দেশে অন্তত বুঝে নিতে সমস্যা হয় না – পাঠক বুঝতেই
পারবেন তাঁর আশপাশের প্রায় রোজ ঘটে যাওয়া ঘটনায়, যা নানা সংবাদমাধ্যমে এমনকি
সোশ্যাল-মিডিয়ার দূতিয়ালিতে চাইতে বা না চাইতেই এসে পৌঁছয় গোচরে। দস্তয়েভস্কি
প্রাণে বাঁচলেন কিন্তু সাইবেরিয়ায় সশ্রম নির্বাসনে গেলেন, সেই বরফ ঠান্ডা রুক্ষ
কষ্টকর শিবিরে দেখলেন জীবন। অপরাধীদের মধ্যে আবিষ্কার করলেন মানুষের দুঃখময়
অস্তিত্বকে। একই সঙ্গে মানুষ পাপী ও পবিত্র, সমাজ এক ব্যক্তির সমস্ত ভালোত্বকে
কীভাবে শেষ করে দিতে চেষ্টা করে আর তার মধ্যেও মানুষের মনুষ্যত্ব টিঁকে থাকে।
দস্তয়েভস্কি শুধুমাত্র মরমিয়া লেখক হয়ে উঠলেন না তা আমাদের কাছে সত্ত্বেও – বরং তিনি খুঁড়ে
দেখতে লাগলেন মানুষ নামের সেই আশ্চর্যকে, শেক্সপিয়রের ডেনমার্কের রাজপুত্তুর যাকে
বলেছিল হোয়াট আ পিস অফ ওয়র্ক। ঘটনার ঘনঘটাপূর্ণ সাবেকি উপন্যাসের খোল নলচে পালটে
তিনি তা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতের ছবি আঁকলেন। ‘নোটস ফ্রম
আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর মতো উপন্যাস যা ঘটনা ও চরিত্রের বাইরের বর্ণনার
থেকেও তার অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি, গল্প বলার প্যাঁচ-পয়জার নেই বরং ঢিলেঢালা, যেন
তার সে বিষয়ে আগ্রহই নেই। একজন ফ্ল্যাটের বেসমেন্টে থাকা নামহীন চরিত্রের
স্বগতোক্তি – এ উপন্যাস যেমন পরবর্তীতে জয়েস ও ভার্জিনিয়া উলফের মতো
স্ট্রিম অফ কনশাসনেস বা চেতনাপ্রবাহমূলক উপন্যাসের বীজ তেমনি কাফকার অনামা ‘কে’ নামক নায়কের পূর্বসূরি। দস্তয়েভস্কি সেই প্রথম আধুনিকদের একজন যিনি
বুঝেছিলেন ব্যক্তি মানুষের জীবন কি-ভাবে পূর্ণতার
থেকে দূরে সরে যাচ্ছে পুঁজিবাদী ও শিল্পবিপ্লব পরবর্তী পৃথিবীতে যা আমাদের সময়ে
হাড়ে হাড়ে টের পাই আমরা। এবং সে মানুষ অসহায় হলেও নিরপরাধ নয়। ক্রাইম অ্যান্ড
পানিশমেন্ট তিনি লিখতেন না তাহলে। বিনা অপরাধে দণ্ডিত হয়েছিলেন যে আদর্শের জন্য,
সেই থেকে তাঁর সম্যক জ্ঞান হয়েছিল, যার ফসল ‘ক্রাইম অ্যান্ড
পানিশমেন্ট’। প্রবল দারিদ্রের থেকে রেহাই পেতে রাসকোলনিকভ এক
বৃদ্ধা বন্ধকের-কারবারিকে খুন করে টাকার জন্য।
মেধাবী ও দার্শনিক খুনি রাসকলনিকভের মনের অবস্থা ও নানা তর্ক-বিতর্ক যেমন দেখতে
পাই তেমনি দস্তয়েভস্কির প্রশ্ন তার সময়ের রাজনৈতিক দর্শনের। যদি সমাজ ও রাষ্ট্র
ব্যবস্থা অনৈতিক হয় তাহলে ব্যক্তির কোনো অপরাধ না করার নৈতিক দায় আছে কি-না? হয়
নৈতিকতার সাম্য থাকবে সবার জন্য নয়তো রাষ্ট্র বা সমাজের নিয়ম মেনে চলা ব্যক্তির
দায় নেই, সে নিজ প্রয়োজনে হিংস্রতম কাজও করতে পারে সমাজকে ধ্বংস করতে। এবং সেই অবস্থায় ব্যক্তি মানুষের
মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে তারই কথন উপন্যাসটি। একই সঙ্গে নিষ্ঠুর রাষ্ট্র ও তার
প্রতিস্পর্ধী নিহিলিস্ট বিপ্লব দুয়েরই চেহারা স্পষ্ট হয়ে যায়। ইডিয়ট, পসেসড,
কারমাজভ ব্রাদার্স সমস্ত উপন্যাসেই আমরা এটা পাই। কিন্তু এটাই সব নয়।
মবলগে দস্তয়েভস্কির সাহিত্যের
প্রাথমিকি দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা গেল। শুধুমাত্র এ জন্যই দস্তয়েভস্কি রসিক
পাঠকের কাছে এখনো পৌঁছচ্ছেন তা নয়। দস্তয়েভস্কি লেখক হিসেবে তার থেকেও বেশি কিছু।
সেই বেশিটুকু নিয়ে আলোচনা হল আবহমানের গল্প বলার আলোচনা, আখ্যানের রসের কথাকে উপলব্ধি
করা। সে কাজ যত না সমালোচকের তার চেয়েও বেশি রসিকের। কারণ মনস্তত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব
ইত্যাদি নানা পেশাদার উপায় শেষ পর্যন্ত কোনো লেখাকে টিঁকিয়ে রাখতে পারে না যদি না তার
সেই নান্দনিক দিক থাকে। আমরা ফিরে যাই চলুন দস্তয়েভস্কির প্রথম দিককার লেখায় দ্য ডাবল নামে পরিচিত
উপন্যাসে। উপন্যাসটিকে স্কিৎজোফ্রেনিয়ার এক আদর্শ চিত্রায়ন বলা যেতে পারে, নায়ক গোলিয়াডস্কিন
ও তার যমজ, যাকে সে আবিষ্কার করে, এবং তার সঙ্গে আদানপ্রদানের গল্প চলে। আমরা শেষে
গিয়ে বুঝতে পারি, সে যখন আ্যাসাইলামে যায়, যে এই জুড়িটি তার মানসিক প্রক্ষেপণ। গোলিয়াডস্কিন সমাজে অযোগ্য, সে যেন মূর্ত অনারাম আর তার এই জুড়িটি উলটো। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে
গল্পটা দেখা যায়, কিন্তু তার চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন রয়েছে।
কোনটা আসল গোলিয়াডস্কিন? পরিচয়ের এই খোঁজ উপন্যাস শেষে আমাদের অস্বস্তিতে
ফেলে। এবং এই কেতাবখানাও কি আসলে একটা খোঁজ না? লেখক যে কল্পনায় একটা সমান্তরাল
দুনিয়া তৈরি করেন, যেন সেই সমান্তরাল তৈরির গল্পটাকেই প্রশ্ন করছেন দস্তয়েভস্কি।
কোন মানুষটা আসল, কোন চরিত্রটাই বা চরিত্র, এবং মজার বিষয় আমরা দুটো কাল্পনিক চরিত্রর
মধ্যে কোনটা কাল্পনিক সেই নিয়ে ভাবতে বসছি এই গল্পটা পড়ে। এইটাই আবহমানের গল্প
বলার গোড়ার কথা। বাস্তবের একজন মানুষের পরিচিতিও এক কাতারে চলে না, যদি
দস্তয়েভস্কিকেই ধরি, তিনি একজন নির্বাসনে কাটানো রাজনৈতিক কর্মী, লেখক,
বেহিসেবি-জুয়াড়ি – কত রকমের পরিচিতি তাঁর, এবং সেগুলোর কোনো একটাই তিনি নন
আবার কোনোটা বাদ দিয়েও তিনি হতে পারেন না। এই পরিচিতি এক ব্যক্তির নিজের কাছে যা
তা তার উলটোদিকের মানুষের কাছেও তা নয়। এই নিয়ন্ত্রণহীনতার উপশম সমান্তরাল পৃথিবী
তৈরি করা কল্পনায়। গ্যাম্বলারের অ্যালেক্সির জেতা বা হারাটা আসল নয় যতটা না
উপন্যাসের কথনের যে পরিমিত সৌন্দর্য্য। সে নিখুঁত, নিটোল পৃথিবীর কাছে তার দস্তয়েভস্কির
নিজস্ব জুয়াড়ি জীবন নিরস, অপরিপূর্ণ, অচল।
গল্পের কাজ মানুষের এই ভাঙা, খণ্ডিত যাপনকে আরো সুনিপুণ সৌন্দর্যে ফুটিয়ে
তোলা – দস্তয়েভস্কির তার অবলেশ রূপ ধরতে চেয়েছেন বারবার। রাসকলনিকভের
মতো মানুষ যদি বাস্তবে থাকে তাকে আমরা কী বলব, খুনি বা সন্ত? হ্যামলেট যেমন অতগুলো
খুন করতে দেখেও – যার মধ্যে গিল্ডেনসটার্ন ও রোসেনক্রান্টসকে ঠান্ডা মাথায়
পরিকল্পনা করে মারাও রয়েছে – আমরা দেখি ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবে, তার আত্মপরিচিতির
অন্বেষণ আমাদের কাছে আখ্যানের গুরুত্ব তৈরি করে। কারণ হ্যামলেট যতটা রক্তমাংসের
মানুষ ততটাই মানুষের নির্যাস বা এসেন্স। রাসকোলনিকভও তাই। হ্যামলেট না থাকলে রাসকোলনিকভ হত না। প্রতি
আখ্যানই তার আগের আখ্যানের পাঠান্তর, এবং পূর্ব আখ্যানই পরবর্তীর বীজ। আগেই
লিখেছিলাম কাফকার কে-র কথা। যা বারবার মনে করিয়ে দেয় নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ডের
নায়ককে। কে দুর্গে পৌঁছবে না, রাজার চিঠি আসবে না কিন্তু মানুষের জীবনের এই শাশ্বত
না-গুলোকেও একটা পারফেকশানে পৌঁছে দিতে পারে কল্প-আখ্যানের দুনিয়া।
এখন পারফেকশান বা নিটোল শব্দটার সঙ্গে জমাট-বাঁধা বা নির্দিষ্ট বাঁধনের একটা ধারণা তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যারা খানিক নির্মাণের সুশৃঙ্খলায় অভ্যস্ত, যেমন পেশাদার সমালোচক বা লেখক তাদের মাথায় – কিন্তু এটা তার বাইরের বিষয়। শৈলীর নিভাঁজ, নিপাট্টর কথা এটা নয়, ও বাইরের একটা দিকমাত্র। ক্রাফ্ট বা কারিগরিকে ছাড়িয়ে, আখ্যানকারের এই যে আবহমানের আখ্যানে একটু যোগান দিয়ে যাওয়ার খেলাটুকু থাকে তার জন্যই বাকি সব কিছু। অর্থাৎ বাস্তব ও কল্পনার সেতুটাকে কীভাবে জুড়ে একটা সমান্তরাল পৃথিবী তৈরি করা যায়। দস্তয়েভস্কি যেমন পসেসডের চরিত্রদের নিয়ে তৈরি করেছেন, তেমনি দস্তয়েভস্কি আজ আমাদের কাছেও তো একজন চরিত্র যার সম্পর্কে আমরা জানতে পারি বই পড়েই। কোয়েৎজি যে কারণে তার উপন্যাসের নায়ক হিসেবে দস্তয়েভস্কিকে রাখলেন, ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রথাগত তথ্য-নিষ্টতার ধার ধারলেন না, বরং দস্তয়েভস্কিকে করে তুললেন অনেকটা দস্তয়েভস্কির তৈরি করা চরিত্রদের মতো, এবং সম্পূর্ণ একটা কাল্পনিক আখ্যান লিখলেন দস্তয়েভস্কিকে নিয়ে। কাজেই এই প্রবন্ধের শিরনামকে নেহাত চমক ভাববেন না পাঠক, বরং ভাবুন আখ্যান মানেই একটা কান-ফিসফিস খেলা যেখানে প্রতিবার একটু করে বদলাতে থাকে পরিচিতি, দুশো বছর পরে দস্তয়েভস্কিকে নিয়ে ভাবলেও এমনটাই হবে এবং সেটাই হবে দস্তয়েভস্কির প্রকৃত স্মরণ।
প্রকাশিত: কথা সোপান পত্রিকা
.jpg)


No comments:
Post a Comment