নীল ক্যাসিডির গাড়িতে একবার উঠলে আর নামা যায় না বুঝিনি
তখন । সেই যে একটা গান শুনেছিলাম ছোটবেলায় হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া সেই এক ভূতে পাওয়া
হোটেল যাতে ঢোকার রাস্তা আছে কিন্তু বেরনোর উপায় নেই, প্রিজনার অফ ওন ডিভাইস – নীল ক্যাসিডির
গাড়ি না ক্যেরুয়াকের কলম যাই হোক না কেন একবার ধরলে ছাড়ন নেই। যদিও ওই যে বললাম
বুঝিনি তখন। কুড়ি বাইশ বছরের যুবকের কাছে ‘অন দ্য রোড’ এমন নেশা যা কোনো
রিহ্যাব ছাড়াতে পারে না – তাদেরও উপায় জানা নেই।
এহেন বই মনে আছে কিছুদিন আলমারি-বন্দি ছিল, ভুলেই
গেছিলাম নানা বইয়ের মাঝে। তারপর প্রথম পাঠ, সে অভিজ্ঞতা শুধু তাদের জন্য যারা
ওই বয়সে পড়েছে। গোটা পৃথিবীকে দেখাটা বদলে
গেল এক ঝটকায় – সমাজ, জীবন, যাপন সবকিছুকে নতুন চোখে দেখা। এব্ং ওই ‘ইচ’ এর পাল্লায় পড়া।
উদযাপন নিয়ে আমার যে হ্যাংলামি তার জন্য হয়তো পুরোপুরি দায়ী ক্যেরুয়াক। নাহলে কী
হত, সাহিত্য চর্চা, সাংবাদিকতা এসব নিয়ে দিব্যি থেকে যেতাম ক্যেরিয়ার নামক কিছুর
একটা খোঁজে, সাহিত্য চর্চাও খানিক হত সবদিক বাঁচিয়ে। কিন্তু বারবার দূরছাই
ভাল্লাগছে না ব্যস এবার একটা বদল দরকার – এমনটা হত না। ওই যে বন্দী মানুষ
আমি, নাকি রাস্তার উপরে থাকার একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গেল, যেখানে বাড়ি বা রাস্তা
বলে আলাদা করে কিছুই হয় না আসলে সবই স্থাবর আবার সবই জঙ্গম তুমি যেভাবে দেখতে চাও
এই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা যা তোমায় তীব্রতা দেবে সে কষ্টেরই হোক বা আনন্দের – এর থেকে বড় উদযাপন
জীবনে আর নেই।
সল প্যারাডাইজ বা ডিন মরিয়ারটি এত কাছের হয়ে উঠল কেন?
বিদেশী কোনো চরিত্রকে এমন মনে হয়নি, রাসকোলনিকভের সঙ্গে আলাপ অসুখের বিছানায় শুয়ে,
জেক বা স্যাম হেমিংওয়ের প্যারিসের সব দামালেরা বা পিয়্যের-এর মতো যুদ্ধ ও
শান্তিতে অবিচল কেউ আমাকে এভাবে বদলে
দেয়নি। অথচ ওই হিচহাইকিংময় ওই নেশাময় ওই প্রেমময় আমেরিকান বিট জীবন আমাদের খুব সহজ
নয় আপাতভাবে ( বুদ্ধদেব বসু সতর্ক করেছিলেন তার জামাইকে এদের সম্পর্কে) তবু কিছু
একটা ভিতরের মিল ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি মানুষটা খানিক তেমন? না, শুধু তা নয়
সময়টাও তো ছিল তেমনই। নব্বইয়ের দশকে কলকাতায় বেড়ে ওঠা যেখানে বিশ্বায়নের খোলা
হাওয়া বইতে শুরু করেছে আর তার মাঝে শহরতলির এক মধ্যবিত্ত ছেলে নিজেকে খুঁজতে পারছে
না সে একই সঙ্গে ওই ব্যবস্থার গিনিপিগ ও ভোক্তা – কাজেই সে খুঁজে
পাবে তার ছটফটানির সঙ্গে মিল সল বা ডিন-এর। নব্বইয়ের দশকে যারা এই নতুনের ঝাপটা
পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি তাদের কয়েকজন সে আমার বন্ধু জয় বা কবি সোমাভ (যদিও অনেক
পরে আলাপ) প্রত্যেকের মধ্যে এই না-থিতু ব্যাপারটা রয়ে গেল।
গোটা পৃথিবীতেই এমন রয়েছে, শুধু আমার দেশে নয়। বাইশ তেইশ
বছর বয়সে প্রথম ট্রেক-এ যাচ্ছি, পাড়ার বন্ধু থেকে চায়ের দোকানের কর্মচারী নিয়ে সে
এক আজব দল, ট্রেনে আলাপ হল একটি চেক ছেলের সঙ্গে সেও যাচ্ছে পাহাড়ে এবং স্যান্ডো
আর হাফ প্যান্ট পড়ে দাঁত মাজতে মাজতে সে বললে তার এই আসাটা অন দ্য রোড পড়ার
দৌলতেই। বুঝলাম আমি একা নই, এখনো অনেকেই মজে।
চরকিবাজি আর বোহেমিয়ানিজম-এর সহজ চশমায় শুধু দেখলে অবশ্য
অনেককিছু হারাতে হতে পারে – ‘অন দ্য রোড’ তাই ‘ধর্মা বাম’ ছাড়া পূর্ণ নয়।
নীলের সঙ্গে অবিরাম ঘুরে যাওয়া নয় স্নাইডারের জেন বুদ্ধধর্ম ও তার শান্ত সমাহিত
হাইকু চর্চা, তার যাপনের বাহুল্যকে বাদ দিয়ে একটা নান্দনিকতা তৈরি খুব খুব জরুরি।
উদযাপন কী তা বুঝতে গেলে একইসঙ্গে যাপনের নানা দিক জানতে হয়। শুধুমাত্র রিক্ততার
চর্চা দিয়ে হয় না, ও কবির কাজ নয়, লেখকের অভীষ্ট নয় – বরং দুই প্রান্তকে
নিজের মধ্যে দিয়ে মিলিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এমনকি তার ব্যর্থতা থেকেও সৃজন
সম্ভব। ক্যেরুয়াক থেকে প্রথম আমি বুঝতে পারি সহজে।
অনেক পরে যখন ড্রিমার্স দেখি, সেই বিখ্যাত শেষ দৃশ্য
যেখানে তিন বন্ধু প্রায় আত্মহত্যা করতে শুয়ে এমন সময় প্যারিসের রাস্তায় বিশাল
মিছিল আর তারাও তাদের ব্যক্তিগত যাপনের ওই ওঠাপড়ার পরও মিশে যাচ্ছে তাতে, মলোটভ
ককটেল হাতে প্রতিরোধের যুদ্ধে সামিল হচ্ছে। ষাটের এই যৌবনের বিদ্রোহ সম্ভব বিট
মুভমেন্টের জন্যই।
আমাদের সমস্যা হল এই সহজ মিশে যাওয়াটা যে মানুষেরই তা
বুঝতে শিখিনি তাই বিটদের নিয়ে আনেক ভুল ধারণা রয়েছে – এমনকি প্রগতি
সাহিত্যও এদের পছন্দ করে না, কারণ সদর দফতরে কামান দাগাটা প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন
করে। আমাদের প্রগতিশীলতার দর্শনও বহুদিন এই প্রতিষ্ঠান তৈরির চক্করে পড়ে রয়েছে। সর্বত্র
হাই আর্ট হাই কালচারের বিরুদ্ধে একই রকম কিছু তৈরির চেষ্টা, বিপ্লব বা প্রতিরোধ
মানে এক অদ্ভুত বামুনপনা যেখানে মানুষের স্বাভাবিকতার জায়গা নেই সে হাসতে ভালবাসতে
উদযাপন করতে পারবে না জীবনকে । সে চেষ্টা জলে গেছে দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু অন দ্য
রোডের মুক্তির ডাক এখনো শাশ্বত। সরাসরি মানুষে মানুষে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলা যায়
এখনো এ বিশ্বাস রাখা যায়।
অন দ্য রোড
জ্যাক ক্যেরুয়াক
প্রথম প্রকাশ: ১৯৫৭



No comments:
Post a Comment