Saturday, April 13, 2019

বোদলেয়ার ও আমাদের না বোঝা আধুনিকতা

গুস্তাভ কুর্বে: পেইনটার্স স্টুডিও (ছবির ডান কোণে বোদলেয়র উপস্থিত)

আধুনিকতা শব্দটা নিয়ে বাংলা কবিতায় চর্চা নতুন নয়, একুশ শতকে বসে সেই একশ বছরের চর্চার রেলগাড়ি চরতে গিয়ে হাল অধুনা তুফান মেলের মতো হতে পারে, হোঁচট পদে পদে। আর যখন বিষয় বাংলা কবিতাকে এই নির্দিষ্ট একটি টার্মের নিরিখে দেখতে যাওয়া, তখন সমস্যা হবেই। একটা পাশ্চাত্যের ধারণাকে ঔপনিবেশিকেতার জোয়াল টানা সাহিত্য সৃষ্টির নিরিখে টেনে আনা। তাহলেও কোথাও থেকে তো একটা শুরু করতেই হয়। এবং উনিশ  শতকের ফরাসি আধুনিকতা ও বোদলেয়ারের প্রসঙ্গ টেনে এনে তাকে দাঁড়  করানোর পিছনে একটা কারণ আছে সেটা লেখাতেই প্রকাশ পাবে।
এখন বোদলেয়রকে নিয়ে প্যাচালটা পারতে শুরু করলাম কেন? টিএস এলিয়ট-এর একটা লেখা সাহস জোগাল। পাসকাল এর পেনসিস-এর আনুবাদ পড়ছিলাম, এলিয়ট সাহেব সেই বইয়ের ভূমিকায় একটা ভাল কথা লিখেছেন যা আমাদের ক্ষেত্রেও খাটে। তিনি লিখেছেন, প্রত্যেক প্রজন্মেরই পাসকাল পড়া উচিত, তার কারণ এই নয় যে পাসকাল বদলে যাবেন কিন্তু প্রত্যেক প্রজন্মের সময় ও ভাবনা বদলে যায় তাই তাদের নিজেদের সময়ের মতো করে বুঝে নিতে হবে পাসকালকে।
আমারও মনে হল এটাই, বোদলেয়ার ও তার আধুনিকতাকে সামনে রেখে বাংলা কবিতার সমসময়কে ধরার চেষ্টার কারণও তো এটা। বুদ্ধদেবরা যেভাবে দেখেছেন সেটা তাঁদের সময়ের নিরীখে, আমাদের বদলে যাওয়া সময়ের আবার দরকার পড়ছে ফিরে দেখা

বোদলেয়ার, আধুনিকতা, কবিতা, এই তিনের সমন্বয় তৈরির পিছনে রয়েছে যে রসায়ন তা হল একটা বোধের গল্প। সেটা একজন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়, সে বোদলেয়ারের মতো প্রতিভা এবং ক্ষুরধার মস্তিষ্ক হলেও নয়। এটা বুঝতে হলে আধুনিকতা বা মডার্নিজম আসলে কোনো মতবাদ নয় বা তত্ত্বও নয় কোনো, সেটা সমাজ এবং ব্যক্তির মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্বের নির্দিষ্ট অবস্থান সেটা স্বীকার করতে হবে আগে।
কী সেই অবস্থা? উনিশ শতকের পশ্চিম ইউরোপে গতিশীল সামাজিক ভাঙাচোরার মাধ্যমে গড়ে উঠতে থাকা সমাজের প্রতি সংবেদনশীল মানুষের প্রতিক্রিয়াএই ব্যাপারটা বুঝে ফেলা খুব জরুরি যে একটা নির্দিষ্ট অবস্থা থেকেই মডার্নিজম তৈরি হতে পারে। বোদলেয়ারের ফ্রান্সে পুঁজিবাদ ঢুকেছে কখনো ভয়ঙ্কর সংঘর্ষ তো কখনো আপোষের মাধ্যমেএই পুঁজিবাদই সামাজিক ভাঙাগড়ার অনুঘটক। বুর্জোয়া রাজতন্ত্রের আমলে ফ্রান্সে জীবনযাপনে প্রথম বদল আসতে শুরু করেপ্রভেন্সালিজম-এর জায়গা নিতে থাকে শহরমনস্কতা যা বুর্জোয়া ধ্যানধারণার থেকেই আসে। এবং এই পরিবর্তন ঘটে দ্রুত। আর এর ফল সুদূরপ্রসারী
গ্রাম থেকে কৃষকেরা শহরে আসতে থাকে। আরবান প্রলেতারিয়াতের সৃষ্টি হয়। এবং পুরনো সামাজিক হায়ারার্কি যা ছিল সামন্ততন্ত্রের উপর দাঁড়িয়ে অর্থাৎ বংশ কৌলীন্য তার জায়গা নেয় টাকা। অর্থই শেষ ক্ষমতার পরিচায়ক। এটা প্যারিসের চেহারা বদলে দেয়। গলিঘুঁজি আর প্রাসাদের শহর ভেঙে বড় বড় চওড়া রাস্তা, বুলেভার্ড, আর্কেড দিয়ে সাজানো হয় তাকে অর্থাৎ আধুনিক প্যারিসের যে রূপ। ১৮৫০-এর দশকে এই বদলের শুরু। এর কারণ প্রথমটা যদি হয় রেল লাইন এবং স্টেশন পাতার সুবিধে, যাতে বাজার আর মালের সম্পর্ক সহজ হয়, দ্বিতীয়টা ভয়। এই শহরের বৈপ্লবিক চেহারা দেখা গেছে তার আগের শতকের শেষভাগ থেকেই। কে না জানে ওই গলিঘুঁজির রাস্তায় যখন তখন গজিয়ে উঠতে পারে ব্যারিকেড। বুর্জোয়াসি বিপ্লবের সূচনা করেছিল যেভাবে, বিক্ষুব্ধ প্রলেতারিয়াত-ও একইভাবে তাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পারে, তা তারা ভাল মতোই বুঝতোসেটা সামাল দিতে খোলামেলা বড়বড় রাস্তা প্রয়োজন, যেখানে সহজেই আধুনিক অস্ত্র প্রয়োগ করা যায়।
এই নগরায়ন বদলে দিল সামাজিক অবস্থাআগে একই অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বড়লোক এবং গরিবরা থাকত, কখনো কখনো একই বাড়িতে। এবং তারা নির্দিষ্টভাবে একে অপরকে চিনত, জানত, কিছুটা আদানপ্রদান ছিল ব্যক্তিগত স্তরে এবার যেটা হল প্রচুর মানুষের ভিড় বাড়তে লাগল শহরে। ফলে বাসস্থানের দাম বেড়ে গেল। এবং গরিবরা শহরের প্রান্তে নতুন গড়ে ওঠা শহরতলীর দিকে চলে গেল। ফলে কোনো দুই আলাদা শ্রেণির ব্যক্তি একে অপরকে চেনে না আর, শুধু দেখে রাস্তায় বা অন্যভাবে বললে পাবলিক ডোমেইন-এ। ফলে অপরজন শুধুমাত্র শ্রেণিই, ব্যক্তি পরিচয়ের জায়গায়ই নেই। এই যে দুম করে এতটা বদল তার অভিঘাত এল ভাবনায়, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন যাকে বলেছেন শক অফ নিউ
আর সেই সামাজিক অবস্থানের সঙ্গেই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে গড়ে উঠল আধুনিকতার সৃজন এবং মনন। ভিড়ের চেহারা, তার ভাষা, তার বৈশিষ্ট্য কী, তার থেকে শিল্প কী তৈরি হতে পারে, এই ভাবনার দরকার পড়ল। পুরনো সময়টার স্মৃতি টাটকা রয়েছে কিন্তু সেই জগতটা নেই হঠাৎই এর থেকে যে ডিসলোকেশন এবং এলিয়েনেশন তার অভিঘাত পড়েছে। এলিয়েনেশন দুধরনের, এক পুরনো জগতটা নেই; দ্বিতীয়ত, নতুন যে সমাজ তাতে মানুষে মানুষে ব্যবধান বিশাল।
যা কিছু কবিতা নয় তার থেকে কবিতাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বোদলেয়ার লেখেননি, এটা মালার্মে সম্পর্কে খাটতে পারে বোদলেয়ার নয়। তাই বোদলেয়ারের কবিতার সঙ্গে মিল পাওয়া যেতে পারে বুনুয়েল বা ত্রুফোর সিনেমার অনেক বেশি, অনেক কাছে কাফকার উপন্যাসবোদলেয়ার লেখক এবং তার পাঠকের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছেন এটা ঠিক, কিন্তু তার লেখার বিষয়বস্তু তার পাঠকই। কারণ সামাজিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে এদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। সবাই এখানে একা এবং পরস্পর অপরিচিত।
 এমন কিছু নেই তাঁর কবিতায় যা পড়ে সুখস্মৃতির উদ্রেক হতে পারে পাঠকের মনে, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বলেছেন তাঁর সম্পর্কে। স্মৃতি জাগানোর মতো কোনো বস্তু যেহেতু নতুন এই আরবান ক্যাপিটালিস্ট স্পেসে নেই, এত দ্রুত সব বদলে গেছে পারিপার্শ্বিক থেকে যে সেখানে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ব্যক্তির নিজের স্মৃতি সেখানে অপর হয়ে যাচ্ছে আর সেটা নিয়ে দুঃখ রয়েছে শুধুএখান থেকেই শুরু হচ্ছে বোদলেয়ারের আধুনিকতা, যে বোধ অনেকটা একটা ইনসমনিয়া যা সারাক্ষণ জাগিয়ে রাখে আমাদের তাই বোদলেয়ার আধুনিকতার উদাহরণ হিসেবে লেখেন কনস্টান্ট গী-এর কথা।  যে আঁকিয়ে সারাদিন শহরে ঘুরে বেড়ায়, সব অভিজ্ঞতা শুষে নেয় এবং রাত্রিবেলা পাগলের মতো বসে আঁকতে থাকে ‘bending over his table, darting on to a sheet of paper the same glance that a moment ago he was directing toward external things,…..as though image might escape him,’  এটা সেই অবস্থা যেখানে শিল্পী এবং স্রষ্টাকে তাই বোদলেয়ারের ভাষায় থাকতে হয় ইন আ স্টেট অফ কনভালশান। কারণ স্মৃতি এখানে তাৎক্ষণিক সৃষ্টি, ঐতিহ্য থেকে, ব্যক্তিগত ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন। শহরের ফ্যান্টাসমাগোরিয়া থেকে সৃষ্টি করতে হয় শিল্প।
‘by modernity I mean the ephemeral, the fugitive, the contingent, the half of art whose other half is the eternal and the immutable.’ বোদলেয়ার এভাবেই দেখেছেন আধুনিকতাকে। সমসময়ের চিহ্ন বুকে নিয়ে যে বোধ তৈরি হয় শাশ্বত-র দিকে চেয়ে। এই সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট বোদলেয়ার বিশুদ্ধ কবিতার দুর্বোধ্যতা এবং রোমান্টিক কবিদের আবেগের থেকে সরে একটা ভাষা তৈরি করছেন যা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করছে সমাজের দিকে এবং নিজের দিকেও। এই কাটা-ছেঁড়ায় ব্যক্তি যেমন রয়েছে তেমনি সমষ্টিও। নিজের মধ্যে সমাহিত কোনো নায়ক বোদলেয়ারের লেখায় নেই তাঁর লেখায় কথনের শুরুই হচ্ছে সমষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি বা তৈরির ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে  লেখক ও তার নায়ক একদিক থেকে এক, তার পাঠক অচেনা। মধ্যযুগীয় অভিজাত শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা লালিত শিল্পের যে ঐতিহ্য তার জায়গা করে নিচ্ছে বাজার, সেখানে পণ্য হিসেবে সৃষ্টি এসে দাঁড়াচ্ছে এবং পাঠক অদৃশ্য ভোক্তার ভূমিকায়। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সময় শিল্পের অভিঘাত কী হবে এর প্রথম নির্ণায়কদের একজন হয়ে উঠেছেন বোদলেয়ার। তার এই আধুনিকতার সংজ্ঞা থেকেই এসে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজের নান্দনিকতার বোধ কেমন হতে পারে। মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে এর সঙ্গে জেমস জয়েসের ইউলিসিস আধুনিকতার এপিক উপন্যাস যা ক্ষণস্থায়ী আর চিরস্থায়ীর মধ্যের, দৈনন্দিন তুচ্ছ এবং যুগান্তকারী বিশেষ অভিজ্ঞতার মধ্যের সীমারেখা ভেঙে দিয়েছে, জায়গা অদল বদল হয়ে গেছে।  বা কাফকার নায়কদের সমাজ বিযুক্তি, নাগরিক সমাজের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে কিছুতেই সে নিজের জায়গা করে নিতে পারছে না, আপাত স্বাভাবিকতার মধ্যে যে সমাজে লুকিয়ে রয়েছে অদ্ভুত ফেটিশ, এর মাঝখানে ব্যক্তি তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বের চিহ্ন হারিয়ে ফেলছে। আধুনিকতার তীব্রতম বোধ এটাই।  



আমাদের এখানে গত দুদশক ধরে আর্থ-সামাজিক চেহারাতে এক বিরাট বদল ঘটেছে। বিশ্বায়ন ও খোলা বাজার অর্থনীতির হাত ধরে ক্যাপিটালিজম এই প্রথম সরাসরি হাত রেখেছে এ দেশে। এই আগ্রাসন এত দ্রুত এবং এত সর্বাত্মক যে আমাদের সমাজের, আমাদের মানসিকতার খোলনলচে বদলে গেছে এক প্রজন্মের মধ্যেই।
গত শতকের আশির দশকের শেষের দিকে, যে ছেলেটার বয়স ছিল দশ সে দেখেছে হয়তো তার বাড়িতে, যা এই কলকাতা শহরেও, কয়লার উনুনে রান্না হচ্ছে। ফোন মানে ভারি কালো গম্ভীর ক্রিরিরিরিং আওয়াজ। ট্রাম চলেছে মন্থর গতিতে। তখনও চিঠি আনে পোস্টম্যান, তাড়াতাড়ি চিঠি পাঠাতে টেলিগ্রাম করতে হয়। আর টেলিভিশন মানে বাঁধাধরা কয়েকটা প্রোগ্রাম। বেড়াতে যাওয়ার এক্সটিক লোকেশন মানে মরিশাস নয় কুলু মানালি বা রোতাং পাস।  
এই ছবিটা এখন মনে হয় না কত দূর ধুসর? এই গল্পটা আমাদের নয়, কোনো এক অন্য যুগের অন্য কোনো মানুষদের গল্প। নতুন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা এই প্রথম কি আমাদের নাগরিক করে তুলল? এই প্রথম কি আমাদের স্মৃতিতে কোনো কাশবন, ধানের ক্ষেত, বিস্তৃত প্রাকৃতিক নিসর্গের ব্যক্তিগত ভাণ্ডার নেই?  এখন শহরের সীমানা ডিঙলে আরো শহর, হয়ে উঠছে শহর, হয়ে উঠবে শহর আর হয়ে উঠতে চাওয়া শহর রয়েছে। এ কথা একবর্ণ মিথ্যে নয় যদি কেউ একবার দক্ষিণের শহরতলীর ট্রেনে ওঠেন, সোনারপুর, সুভাষগ্রাম, বারুইপুর এই সব জায়গার চেহারা আমূল বদলেছে। আর এই চেহারার বদল শুধু তার বহিরঙ্গের নয়, তার মনেরও বদল ঘটে গেছে।
রামকিংকর বেইজ

পণ্য-আকর্ষণ, নগরমুখী জীবন যাপন ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা এর সামনাসামনি হলে আধুনিকতার ভাষা তৈরি হতে শুরু করেএ অবস্থায় না পড়লে শুধুমাত্র তত্ত্ব দিয়ে আর কয়েকটা বই পড়ে নিয়ে আধুনিক মনন তৈরি হয় না। আমাদের এখানে আধুনিক বলতেই ধরে নেওয়া হয় প্রগ্রেসিভ-এর সঙ্গে। রাজনৈতিক-ভাবে বা সামাজিক-ভাবে বা শিল্পের দিক থেকে প্রগতিশীল কাউকে বা কোনো কিছুকে দেখলেই তাকে আধুনিকের তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বহুদিন ধরে। যেমন রবীন্দ্রনাথ, যিনি কোনো অর্থেই আধুনিক হতে পারেন না( এখানে কবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বলছি, তার উপন্যাস বা ছবি নিয়ে নয়) , একেবারে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশ্রয়ী সামন্ততন্ত্রের একটা আবহাওয়ায় তিনি জন্মেছেন তার সমস্যা আধুনিকতার নয়, একটা অপরিণত ভাষা ও সামাজিকভাবে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা নিয়ে চলা পরাধীন জাতির সাহিত্য তৈরি করার, তার ভাবনা, বোধ, রুচির কে নির্মাণ করার। কয়েকটা আধুনিকতার চিহ্ন দেখতে পেয়েই তাকে আমরা প্রথম আধুনিক বলে তকমা মেরে দিলাম ভাবলামও না তাঁর কাজটা কী ছিল।
এ কাজ করতে গিয়ে তিনি যেহেতু সর্বতোভাবে প্রগতিশীল তাঁঁ্র সমস্ত ভাবনায় ও কাজে, তাই তিনি আধুনিক হয়ে গেলেন! আমরা আধুনিকতার তকমা মেরে দিলাম তাঁর ঘাড়ে। সেই হিসেব দেখতে প্রগতিশীলতাই যদি আধুনিকতার একমাত্র শর্ত হয় তাহলে জীবনানন্দ একেবারেই আধুনিক নন বলতে হয়। প্রায় সর্বত্র তিনি প্রগতির প্রতি সন্দেহ আর নৈরাশ্য দেখিয়েছেন, অথবা সে নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা দেখাননি। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে তিনি আধুনিক নন বরং জীবনানন্দই প্রথম আধুনিক মননের মানুষ। বা সে সময় দাঁড়িয়ে একমাত্র। বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাংলায় যে অর্থনৈতিক, সামাজিক পালাবদল ঘটে, তা আধুনিকতার দিকে একধাপ এগিয়ে দেয় আমাদের, জীবনানন্দের মতো হাতে গোনা কয়েকজন তার আঁচ পেয়েছিলেন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও এ দেশটা আলাদা। তৃতীয় বিশ্বের ঔপনিবেশিক শাসনে থাকা একটা দেশ। এমন পরাধীন দেশে যে জাতীয়তাবাদ মুখ্য হবে তা নিয়ে সন্দেহ কী। অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও রাজনৈতিক পরাধীনতা সামাজিকভাবে একটা হীনমন্যতার মানসিকতা তৈরি করে। তার হাত থেকে বেরনো দরকারি ছিল, আবার সেটাই জাতীয়তাবাদকে উসকোয়। এর মাঝখানে শিল্পী বা মননশীলদের অবস্থান কী হবে সেটা খুব অস্পষ্ট নয়। এছাড়াও তখনকার প্রভাবশালী চিন্তা কমিউনিজম তাদের আচ্ছন্ন করে। ফলে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে গত শতাব্দীর প্রথমভাগটা আধুনিকতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে ছিল জাতীয়তাবাদ, সাম্যবাদ এই সব। নজরুলের কবিতা দেখুন, সাম্যবাদ, স্বাধীনতা, এমনকি কালী-ভক্তি কেমন জট পাকিয়ে রয়েছে। এটা নিতান্ত আমাদের সমস্যা।
কারণ ইউরোপের উনবিংশ শতকে তাকালে দেখা যাবে মার্কস নিজে একজন আধুনিকতার সন্তান। তাঁর ভাবনার পরিধি জুড়ে যে অভিজ্ঞতাগুলো রয়েছে, যার থেকে তিনি রসদ টেনেছেন তা বোদলেয়ার, জোলা, মানে-রই জগত। আমাদের এখানে তা হয়ে গেল পরবর্তী শতাব্দীতে এসে মার্কস-এ ইনডক্ট্রিনেশন। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল হয়তো কিন্তু সেটা বোঝার আগেই ইনডকট্রিনেশনটা হয়ে গেছে, ঝাণ্ডা আমরা আগেই তুলে নিয়েছি না বুঝে। মার্কসের নিজের ক্ষেত্রে এই দায়টা ছিল না।
এই প্রশ্নটা পাঠকের মনে উঠতে পারে এ ছাড়া কী কবিতা বা সাহিত্য হতে পারে না? তা নয়, নিশ্চয় সবাই একসঙ্গে এক ধরনের কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখবেন এটা একেবারেই কাম্য নয়। এখানে কথা হচ্ছে আধুনিকতা নামক যে সাহিত্যের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তা নিয়ে। মুশকিল এটাই সমসাময়িকতা আর আধুনিকতাকে গুলিয়ে ফেলে বাঙালী লেখক সমালোচক নিজেরাই বিপদ তৈরি করেছেন। কাউকে আধুনিক নয় বলা মানে তার সৃষ্টিকে যে অবজ্ঞা করা নয় এটা মেনে নিতে সমস্যা রয়েছে। এটা বোধহয় বিদেশী টার্মিনোলজি বলেই সমস্যা।
আরো সরাসরি বললে আমাদের আধুনিকতা যা কিনা নানা তত্ত্ব এবং আন্দোলন থেকে তৈরি হয়েছে, তা কখনোই স্ববিরোধ বা শিকড়বিযুক্তির প্রবল বোধ থেকে তৈরি হয়নি। সে অপুই হোক বা বাঘারু তার কোথাও একটা অন্য জগত রয়েই গেছে। আধুনিকতার মানসিক অবস্থানে এমন কোনো ব্যক্তিগত স্পেস নেই। আমাদের কবিতায় একটা পিছনে ফিরে দেখা রয়ে গেছে, ব্যক্তিগত ইতিহাস রয়ে যাচ্ছে। অথচ সেটা ব্যক্তির জীবনে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। ক্রমশ অতীত আর সে বিযুক্ত হয়ে পড়েছে, যে স্মৃতির পাতা সে ঘাঁটে সেগুলো তার নিজের নয় লিপিবদ্ধ পঞ্জিকা মাত্রএই তীব্র অনুভূতির কবিতা এখন দরকার। বিচ্ছিন্নতার উচ্চারণ রয়েছে আমাদের কবিতায়, কিন্তু সেই বিচ্ছিন্নতা কিসের থেকে তা খুব স্পষ্ট। অস্পষ্ট, ব্যক্তিগত ইতিহাস ও ঐতিহ্যহীন বিচ্ছিন্নতা, যা প্রটাগনিস্ট ঠিক জানেও না, যেন এক অ্যামনেসিয়ায় আক্রান্ত স্মৃতি এই উচ্চারণের আধুনিকতা তৈরি হয়নি। একজন বা দুজনের মধ্যে বা একটি বা দুটি উদাহরণ থাকতেই পারে কিন্তু ভাবনার স্তরে সেটা গভীরে প্রথিত হওয়ার মতো ব্যাপক আকার নেয়নি
তোমাদের শেষ নেই, তৎপর কর্ণিক নিয়ে হাতে
সংস্কারপান্থ হে বন্ধু, ভেঙে যাচ্ছো পুরনো কলকাতা।
অথচ এই বাস্তবতা সঙ্গে নিয়ে যে কবি চলেছেন তিনি একই সঙ্গে সহজেই উচ্চারণ করতে পারতেন মায়াবী সকাল ফিরে এনেছে কে, কে মঞ্জরীর অস্বচ্ছ আলোছায়ে... এমন দৃশ্যকল্প কবিতায় আনাগোনা করছিল অক্লেশে পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে।
তীব্র অসহায়তা বা অধিকারহীন ইতিহাসের বোধ বিরল বাংলা সাহিত্যে। খুব কমজনই লিখতে পেরেছেন এমনভাবে
বিশাল নাকের ওপর, বসে রয়েছে ছোট্ট একটা মাছি
আমি আরও ছোট্ট ছিলাম জখন
চাদর মুড়ি দিয়ে দেখতে যেতাম শাজাহান
   চাদর মুড়ি দিয়ে দেখতে যেতাম সিরাজদ্দৌল্লা
এখন আমি জুতোর দোকানে যাই, জুতো কিনি
বাস থেকে নেমে, বাসের টিকিট, ফেলে দিই ফুটপাতে...
এখানে কবিতার বিশাল আয়োজন, অনুভূতিমালার গভীর আর্তি নিয়ে যে হয়ে-ওঠার ব্যাপার থাকে তা একেবারেই নেই। লেখক এখানে তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বিযুক্ত হয়ে চলেছেন, শাজাহান, সিরাজদ্দৌল্লা ঐতিহাসিক নাটক, তাঁর দেখাটা তবে কী ব্যক্তিগত স্মৃতি, স্মৃতির ইতিহাস না ইতিহাসের স্মৃতি? এই তিন-এর মাঝখানটা ঝাপসা কবিতায়, কারণ পরের লাইনেই চলে আসছে জুতোর দোকানে যাওয়া , বাসের টিকিট কেনা, তা ফেলে দেওয়া। স্মৃতি তৈরি হচ্ছে তাৎক্ষণিক ভাবে, তা ফেলেও দিতে হচ্ছে ব্যবহৃত টিকিটের মতো। এই আধুনিকতায় আমাদের সাহিত্য খুব কমই পৌঁছতে পেরেছে।

তার আরেকটা কারণও রয়েছে, আমরা নাগরিক কিন্তু আরবান নই। এই দুইয়ের পার্থক্য খুব ভিতর থেকে বুঝতে না পারলে বিপদ। ভারতীয় নগর সংস্কৃতি জড়িয়ে ছিল আষ্টেপিষ্টে তার নিজস্ব গ্রামীণ সংস্কৃতির ভিতরেএরপর ঔপনিবেশিক শাসনে যে শহরে সৃষ্টি হয় তার মধ্যেও এর বীজ ছিল। যদি কলকাতাই দেখি, হোয়াইট টাউন বা সাহেবদের অঞ্চল তাকে ঘিরেই আবার ব্ল্যাক বা আমাদের অংশ মার্বেল প্যালেস হোক আর যাই হোক যা কিছু ইউরোপীয় অনুপ্রেরণায় তৈরি তার সঙ্গে কিন্তু মিশে ছিল সনাতন দেশীয় সংস্কৃতি। নবীন ময়রা সেখানে বাদ পড়েনি। আর এই জমিদার শ্রেণী বা উচ্চবিত্তদের বিত্তের উৎপত্তি ছিল গ্রাম থেকেই। চিরস্থায়ী বন্দবস্তের কুফল হলেওভারতীয় রেনেসাঁ বলা যায় কিনা সে প্রশ্নে না ঢুকেও এটা বুঝতে পারছি তা অন্তত ছিল অ্যাসিমিলেশনের চেষ্টা। যে কলকাতার ভিতর একটা পাড়া কালচার, এটার উৎপত্তি সেটাই। ফলে সরাসরি পাশ্চাত্য আধুনিকতা আমদের সাহিত্যে আসবে না সেটা বাস্তব। টার্মিনোলজি আমদানি করলে সবসময় যে তার প্রয়োগ এক হবে এমনটা শিল্প বা সমাজতত্ত্বের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘটে না। আর ওই যে চেষ্টার কথা বললাম সেটাই ঔপনিবেশিকতার জোয়ালটানাদের ডাইকোটমি। এর থেকে নিস্তার অসম্ভব।
স্বাধীনতার পরেও এর রেশ অনেকদিন ছিল, একদিকে জাতীবতাবাদ অন্য দিকে রেনেসাঁর স্মৃতি এই দুইয়ের ফলে তা যে বেশ টিঁকে ছিল তা আমাদের সাহিত্য খুললেই দেখতে পাওয়া যায়। গত শতাব্দীর তিরিশের দশক থেকেই বাংলায় আধুনিক ও নাগরিক সাহিত্য সামনের সারিতে চলে আসে। বুদ্ধদেব বসু বা সুধীন দত্ত একেবারেই নাগরিক লেখক। তবুও তাদের নাগরিকতা দেখলে বোঝা যায় তা সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত, একাকীত্মের যন্ত্রণা তার বেদনার কারণ। সমানাসামনি দেখে ফেলে দেশ ভাগ, দাঙ্গা, এবং অর্থনীতির একটা বিরাট বদল। কিন্তু সম্পূর্ণ শূন্যতা বা ভয়েড নেই। যা আমাদের আছে তাই আমরা বলতে পারি না রাত তিনটের সনেটের মতো - 
যে সব খবর নিয়ে সেবকেরা উৎসাহে অধীর,
আধ ঘণ্টা নারীর আলস্যে তার ঢের বেশি পাবে।
আমরা এত তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারি না কোনো সিন্থেসিসে। আমরা নাচার, এত বেশি খবর বা ডেটা আমাদের প্রতি নিয়ত মগজে ঢুকে পড়ছে যে তার কোনো উৎকর্ষ বিচার করা বা কোনো প্যারামিটারে ফেলার মতো অবস্থাই নেই। অ্যাবসার্ডিটি শুধু রয়ে যাচ্ছে। আমরা বুদ্ধদেব-সুধীনদের আধুনিকতার থেকে অনেকটা আলাদা কারণ সময়টা আরো সত্তর আশি বছর পেড়িয়ে গেছে, আমরা জাতীয়তাবাদ বা রেনেসাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে অনেকটা দূরে, একটা নয়া ঔপনিবেসিক পুঁজিবাদের পরীক্ষ নিরীক্ষার রসদ হয়ে উঠেছি। 


অতীতের সাহিত্য বা ইতিহাস বা দর্শন কে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সে জন্য প্রয়োজন নতুন ভাবনারযদি মিথের ব্যবহার বলি বা ক্লাসিকাল সাহিত্যকে ব্যবহার, আধুনিকতা মানে এগুলোর বর্জন নয় বা পুনর্জাগরণ নয়। বরং সেগুলোকে ভেঙে সমসময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা। বোদলেয়ার তাব্লো প্যারিসিয়েন-এ দ্য সয়ান কবিতায় হেক্টর-এর বিধবা স্ত্রীর উদাহরণ টেনে এনেছেন, কবিতাটা শুরুই হচ্ছে এটা বলে Andromaque, je pense a` vous ! ( Andromache, I am thinking of you)  অ্যান্দ্রোমেকের কথা তার মনে হচ্ছে প্যারিস শহরের বদল দেখে, মানুষের হৃদয়ের থেকেও দ্রুত যে শহর তার চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে। কবিতায় ভেসে উঠছে শহরের বদলে যাওয়ার চেহারা, যা তার কাছে তৈরি করছে নতুন রূপক, এ কথা বলেও বলছেন পুরনো সব স্মৃতি তাঁর কাছে বোলডারের চেয়েও ভারী। খাঁচা ভেঙে পালানো রাজহাঁস তাই একই সঙ্গে তার কাছে sublime and ridiculousঅ্যান্দ্রোমেকে হেক্টরের বিধবা থেকে গ্রিকদের দাসী। এই অধঃপতন তার সময়ের চোখেও আর শুধু ট্র্যাজিডি হিসেবে থাকছে না, বরং  তিক্ত তীর্যকভাবে সাবলাইম ও রিডিকুলাস। তাই পরের অনুচ্ছেদে একই ভাবে তিনি লেখেন je pense a` la negresse, amaigrie et phtisique..( I think of the nigress, wasted an consumptive) এখানে অ্যান্দ্রোমেকে আর প্যারিসের নিগ্রো রমণী এক হয়ে গেছে। একই রকম ভাবে তারা তাদের ইতিহাস বিযুক্ত মহান এবং হাস্যকর। ঠিক যেন একজন আধুনিক লেখকের মতো।
একই সঙ্গে এই যে পুরনো মিথকে মিলিয়ে দেওয়া গেল নতুন দৃশ্যকল্পে এবং নতুন রূপক তৈরি হল যেটা একেবারেই সমসময়ের উপর ভিত্তি করে এই ব্যবহার করার বাংলা কবিতায় সচেতনভাবে জীবনানন্দ ছাড়া পৌনপুনিভাবে করতে দেখার উদাহরণ বিরল। রবীন্দ্রনাথ ঠিকই ধরেছিলেন যে আধুনিকতা মানে বহিরঙ্গের বদলের একটা তালিকা তৈরি নয়, আসবাবের কবি হয়ে উঠলে আধুনিক হয় না (কিন্তু কী ভয়ঙ্কর ভুল, বোদলেয়ারকে সে রকম মনে করা, অবশ্য এটাও ঠিক তাঁর জীবদ্দশায় তিনি কতটা বোদলেয়ারের ইংরেজি অনুবাদ পেয়েছিলেন। আর এটাও মনে রাখতে হবে বোদলেয়ারকে তাঁর সময় বোহেমিয়ান উচ্ছ্বাসের কবি হিসেবে মাতামাতি হত বেশি ) নতুন রূপকে সনাতনের প্রেক্ষিতে ভেঙে চুরে গড়ে তুলতে হয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় তা হয়নি, কারণ একটা আস্তিক সত্ত্বা সবসময়েই তার লেখাকে ঘিরে থাকত। সে অর্থে জীবনানন্দ আমাদের প্রথম আধুনিক। এবং তাঁর সময়ে একমাত্র। বাকিদের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে হয় তাঁরা পড়ে গেছেন কোনো মতবাদের খপ্পরে, নয়ত বেদ উপনিষদ, আমাদের মহাকাব্যকে ব্যবহার করতে গিয়ে সেগুলোর দার্শনিক ভাবনার জালে আটকে পড়েছেন। যেটা আরো ভয়ঙ্কর। একে একধরণের ননসেকুলার আস্তিকতাই বলব।
উৎপলকুমার বসু-র কবিতায় এসে দেখতে পাই এই ইতিহাস বিযুক্ত মহান ও হাস্যকর রূপকে। পরবর্তীতে ভাস্কর চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বা তুষার চৌধুরী এই পরীক্ষা নিরীক্ষা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তা সত্ত্বেও বাংলা কবিতায় আমরা এখনো মাঝে মধ্যেই ওই আস্তিকতার মধ্যে ঢুকে পড়ি। সমসময়ের কবিতাতেও বহুলাংশে মিথ ও তার ব্যবহার কবিদের অজানতেই মধ্যযুগীয় বা পুরনো বুজোর্য়া অর্থের দিকে ঝোঁক নিচ্ছে। লিখতে গেলে মিথ তৈয়ার হবেই, কিন্তু সমস্যা তখনই যে সেটার ঝোঁক কোন দিকে। সরাসরি না-কবিতা লিখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা দেখা যাচ্ছে মান্যতা দিয়ে ফেলছে পুরনোকেই কারণ তা কেন্দ্রে বসিয়ে দিচ্ছে পুরনোটাকেই যখন তাকে অস্বীকার করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তা একটু ছেলেমানুষি বলেই মনে হয়। স্বীকার বা অস্বীকারে দ্বিত্বের মধ্যে না ঢুকে বরং যদি তাকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে দেখা যায় তাহলে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় সেটা অনেক প্রাসঙ্গিক।  
মনে রাখা দরকারি ভিষণ সচেতন ভাবে কোনো শৈলীর ব্যবহার করা আর তার দাসত্ব করার মধ্যে বিশাল তফাত রয়েছে। বহির্জগতের অবস্থান আর নিজের জীবনের যাপন থেকে উঠে আসা বোধের সংঘাত প্রাথমিক ভাবে সাহিত্যের উৎস। এরই এক ধরনের প্রকাশ হল আধুনিকতা। তাই শুধু তত্ত্বকে পুঁজি করে এর সৃজন ঘটানো যাবে সে হয় না আধুনিক সাহিত্য তখনই গড়ে ওঠে যখন সে বোধ তৈরি হয়ে যায় লেখকের মধ্যে, সময়, চেতনা, মননের ক্রিয়াশীলতায়
এভাবে মিথকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিলে একটা অন্তর্ঘাত ঘটানো যাবে। সেক্ষেত্রে এক ঢিলে আনেকগুলো পাখি মরতেও পারে। প্রথমতো, ক্লাসিকাল বুজোর্য়া ও মধ্যযুগীয় সৃষ্টির ভীত নাড়িবে দেওয়া যাবে, দ্বিতীয়তো, সমসময়ের যে আর্থ সামাজিক আবস্থান থেকে যে সাহিত্য হচ্ছে তার একটা রূপ পাওয়া যেতে পারে।  
পাবলো পিকাসো: ঝ দ্য ভিভরে
 
 

বি: দ্র: প্রবন্ধটি লেখার শুরু ২০১১ সালে। অর্কিড পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। চার বছর আগের লেখা এখন পড়তে গিয়ে কিছুটা বদলান দরকার মনে হল। এবং তার জন্য কলেবর বৃদ্ধিও ঘটল। 

গ্রন্থ তালিকা

1.      The Painter of Modern Life and Other Essays; Charles Baudelaire; Phaidon Press
2.      Selected Poems; Charles Baudlaire; Penguine Books
3.      Pascal’s Pensees; Blaise Pascal; E.P. Dutton & Co

১. পদ্য সমগ্র১, শক্তি চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ
২. শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা; ভাস্কর চক্রবর্তী; দেজ পাবলিশিং

ব্যবহৃত ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা

(লেখাটি দু'বার প্রকাশিত  হয়েছে দুটি পত্রিকায়। আপাতত ব্লগে রইল, বিষয়-ভাবনা সময়ের সঙ্গে খানিক বদলেছে,ফলে লেখাটা সমাপ্ত আমি বলছি না, বরং আধুনিকতা ভাবনার উৎস বলা যেতে পারে: ১৩ই এপ্রিল ২০১৯)




2 comments:

Mrinmoy Das said...

এ লেখা আজকের প্যাঁঁচানো শিল্পবোধের জানালা খুলে দিতে অনেখানি সক্ষম। আপাতত এই। বহুজনকে পাঠালাম।
পড়ে আপনার সাথে কথা বোলতে চাই।

The Crimson Ink said...

অসংখ্য ধন্যবাদ। নিশ্চয়ই কথা হবে।